‘জিহাদ’ করলে চিকিৎসা ঋণের বিরুদ্ধে করবো আবদুল এল-সায়েদ – কেন তিনি এই মন্তব্য করলেন যা এখন ভাইরাল?

জিহাদ' করলে চিকিৎসা ঋণের বিরুদ্ধে করবো আবদুল এল-সায়েদ
‘জিহাদ’ করলে চিকিৎসা ঋণের বিরুদ্ধে করবো আবদুল এল-সায়েদ – কেন তিনি এই মন্তব্য করলেন যা এখন ভাইরাল?

মুসলিম সংবাদ যুক্তরাষ্ট্র : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আসন্ন সিনেট নির্বাচন শুধু রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের লড়াই এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই৷ এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে পরিচয়, ধর্ম, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় – এই চারটি বড় ইস্যুর সংঘর্ষও তুলে ধরছে।

আর সেই বিতর্কের মধ্যেই একজন মুসলিম ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের একটি সাক্ষাৎকারের বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। এমএস নাও-এর সাংবাদিক ক্যাটি টুরের সঙ্গে কথোপকথনে এল-সায়েদকে তার ধর্মীয় পরিচয় এবং ‘জিহাদিস্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।

সন্ত্রাসবাদ পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকা থেকে সিরিয়াকে বাদ দিল যুক্তরাষ্ট্র: অতীতের ছায়া কাটিয়ে কি নতুন পথে দামেস্ক?

উল্লেখ্য এই জিহাদিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জবাবে তিনি আলোচনাকে ধর্মীয় পরিচয় থেকে সরিয়ে সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা ঋণের দিকে খুব সুন্দর ভাবে সরিয়ে নেন। তিনি বলেন,” যদি কোনো ‘জিহাদ’ থাকে, তাহলে সেটি হবে চিকিৎসা ঋণের বিরুদ্ধে।”

আসল বিষয় কি ধর্ম, নাকি অর্থনীতি?

এল-সায়েদের বক্তব্য বুঝতে হলে তার নির্বাচনী প্রচারণার মূল বার্তাটি বোঝা জরুরি। তিনি একজন চিকিৎসক, মহামারীবিদ এবং সাবেক সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তার প্রচারণায় স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয়, মেডিকেয়ার ফর অল এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।

জিহাদ' করলে চিকিৎসা ঋণের বিরুদ্ধে করবো আবদুল এল-সায়েদ

আগস্টের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে জয় পাওয়ার পর তিনি এখন রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সের মুখোমুখি হচ্ছেন। এখানেই তার সাম্প্রতিক বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব। তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় পরিচয়, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতি এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

কিন্তু এল-সায়েদ বারবার চেষ্টা করছেন নির্বাচনী বিতর্ককে এসব পরিচয়ভিত্তিক ইস্যু থেকে সরিয়ে “মিশিগানের সাধারণ মানুষ কী সমস্যায় আছেন” তা সম্পর্কে আলোচনা করতে। তিনি মনে করেন, “তার প্রচারণার বিষয় হওয়া উচিত মিশিগানে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবা।”

চিকিৎসা ঋণ কেন তার প্রচারণায় এত গুরুত্বপূর্ণ?

এল-সায়েদের চিকিৎসা ঋণবিরোধী অবস্থানের পেছনে তার সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ওয়েন কাউন্টির স্বাস্থ্য পরিচালক থাকাকালে তিনি এমন একটি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের চিকিৎসা ঋণের বড় একটি অংশ মুছে দেওয়া।

কাউন্টি জাতীয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান Undue Medical Debt-এর সঙ্গে কাজ করে এই কর্মসূচি চালু করে। এর সম্ভাব্য লক্ষ্য ছিল প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার চিকিৎসা ঋণ থেকে বাসিন্দাদের মুক্ত করা। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার।

তাহলে ‘জিহাদ’ শব্দটি কেন ব্যবহার করলেন?

এখানেই বক্তব্যটির রাজনৈতিক যোগাযোগের দিকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ‘জিহাদ’ শব্দটি মার্কিন রাজনৈতিক পরিসরে অত্যন্ত সংবেদনশীল। মুসলিম প্রার্থীর ক্ষেত্রে এই শব্দ ব্যবহার সহজেই জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ ও ইসলাম নিয়ে বিতর্কের দিকে চলে যেতে পারে।

কিন্তু এল-সায়েদ সেই ফ্রেমে প্রবেশ করেননি। বরং তিনি শব্দটিকে ঘুরিয়ে চিকিৎসা ঋণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি কার্যত তিনটি বার্তা দিতে চেয়েছেন- 

নিউইয়র্কের মাঝেই আলাদা এক জগত: হাসিদিক ইহুদিদের ৪৮ ঘণ্টার জীবনে রুহি চেনেত যা দেখলেন

প্রথমত, তার মুসলিম পরিচয়কে নির্বাচনের প্রধান বিষয় বানাতে তিনি আগ্রহী নন।

দ্বিতীয়ত, ভোটারদের কাছে তার অগ্রাধিকার হলো স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয়।

তৃতীয়ত, তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বা পরিচয়ভিত্তিক আক্রমণ যতই আসুক, তিনি বিতর্ককে নীতিগত ইস্যুতে ফিরিয়ে আনতে চান।

এ কারণেই বক্তব্যটি সমর্থকদের কাছে শুধু একটি মজার বা তীক্ষ্ণ উত্তর নয়। বরং তার রাজনৈতিক কৌশলের একটি উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ তার মুসলিম পরিচয় দিয়ে খুব সহজে তাকে সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত করতে পারে।

কিন্তু বিতর্ক কি এত সহজে শেষ হচ্ছে?

না!  মিশিগানের এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এল-সায়েদের বিরুদ্ধে শুধু তার মুসলিম পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন উঠছে না। তার ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতি, হাসান পিকারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে বিতর্ক রয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সও এল-সায়েদকে আক্রমণের জন্য এসব বিতর্ক ব্যবহার করছেন। 

কেন মিশিগানের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ?

মিশিগান যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্য। আর সিনেট নির্বাচনটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা কংগ্রেসের উচ্চকক্ষে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

৪ আগস্টের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে এল-সায়েদ হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে দলের মনোনয়ন পান। এখন নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান মাইক রজার্স। এল-সায়েদ জিতলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হবেন।

Muslim Sangbad YouTube channel ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন

আর এটা কোনো সাধারণ বিষয় নয়, মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হবে। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক সম্ভাবনার পাশাপাশি তার সামনে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাও রয়েছে। বার বার মুসলিম পরিচয় সামনে এনে তাকে ব্যক্তিগত ভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। 

তবে তার বিরুদ্ধে থাকা ধর্মীয় ও বিদেশনীতি-সংক্রান্ত বিতর্ক এত সহজে শেষ হওয়ার নয়। যারফলে নভেম্বরের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন  এখন  এল-সায়েদ কি তার প্রগতিশীল ও মুসলিম ভোটারদের ছাড়াও মিশিগানের বিস্তৃত ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারবে? 

আর যদি তিনি সফল হন, তাহলে এই নির্বাচন শুধু মিশিগানের সিনেট আসনের ফলাফল নির্ধারণ করবে না। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় যোগ করতে পারে। যা আমেরিকান মুসলমানদের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে? 


Source: MS Now

Share on Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।