মুসলিম দেশগুলো একত্রিত হবার আহবান ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের : মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে কি বদলে যাবে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ?
মুসলিম সংবাদ : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আবারও মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। “তাঁর মতে, মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক বিভেদ ও নিরাপত্তাহীনতাকে তৃতীয় পক্ষ নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে।”
২৯ আগস্ট প্রকাশিত এক ভিডিও ক্লিপে পেজেশকিয়ানকে বলতে শোনা যায়, মুসলিম দেশগুলোর একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ককে শাসক ও অধীনস্থের মতো হওয়া উনয়। আমার মনে হয় এ সম্পর্ক ভাইয়ের মতো হওয়া উচিত। তাঁর ভাষায়, “আমরা ভাই, একে অপরের ওপর শাসক নই।” তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে মুসলিম দেশগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলানোর আহ্বান জানান।
তবে এই বক্তব্যকে শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে দেখলে পেজেশকিয়ানের বার্তার বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। এর পেছনে রয়েছে ইরানের নিরাপত্তা-উদ্বেগ, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির প্রস্তাব।
২৭ আগস্টের বক্তব্যে আসলে কী বলেছিলেন পেজেশকিয়ান?
তেহরানে অনুষ্ঠিত ৪০তম আন্তর্জাতিক ইসলামি ঐক্য সম্মেলনে পেজেশকিয়ান আরও স্পষ্টভাবে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতীয় পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই পার্থক্য যেন এক মুসলিম দেশকে আরেক মুসলিম দেশের শত্রুতে পরিণত না করে।
‘জিহাদ’ করলে চিকিৎসা ঋণের বিরুদ্ধে করবো আবদুল এল-সায়েদ – কেন তিনি এই মন্তব্য করলেন যা এখন ভাইরাল?
কোনো মুসলিম দেশ যেন নিজের নিরাপত্তা প্রতিবেশী মুসলিম দেশের অনিরাপত্তার ওপর প্রতিষ্ঠা না করে এবং কোনো দেশের ভূখণ্ড, আকাশসীমা বা স্থাপনা যেন অন্য মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে হামলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। এখানেই পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে।

তিনি এমন কোনো ঐক্যের কথা বলেননি যেখানে সব মুসলিম দেশকে একই রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। বরং তাঁর ধারণা হলো – মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন সংঘাতের কারণ না হয়।
শুধু বক্তব্য নয়, তিনটি প্রস্তাবও দিয়েছেন
পেজেশকিয়ান তাঁর বক্তব্যে মুসলিম দেশগুলোর জন্য কয়েকটি বাস্তবধর্মী উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রথমত, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা ও অনাক্রমণ চুক্তি। দ্বিতীয়ত, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা OIC-এর অধীনে স্থায়ী মধ্যস্থতা ও সংঘাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা। তৃতীয়ত, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও অবকাঠামোয় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা তৈরি করা।
কেন এখন এই আহ্বান?
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বর্তমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান সংঘাতে ইরান মারাত্মক সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। ছয় মাস পরও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
জুনে একটি সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয়নি। একই সময়ে হরমুজ প্রণালী, ইরানের তেল রপ্তানি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো – প্রতিবেশী দেশগুলো যেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত না হয়।
পেজেশকিয়ান তাই একদিকে নিজের দেশের প্রতিরক্ষার অধিকার তুলে ধরছেন, অন্যদিকে প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সংঘাত না বাড়িয়ে সরাসরি নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রস্তাব দিচ্ছেন।
নিউইয়র্কের মাঝেই আলাদা এক জগত: হাসিদিক ইহুদিদের ৪৮ ঘণ্টার জীবনে রুহি চেনেত যা দেখলেন
২৯ আগস্টের আরেক বক্তব্যেও তিনি পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও মিসরসহ প্রতিবেশী ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংলাপ ও সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন।

তাহলে কি এটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুসলিম সামরিক জোটের ডাক?
সরাসরি অর্থে বিষয়টি এতটা সরল নয়। পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে ইসরায়েলকে মুসলিম দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর যুক্তি হলো, মুসলিম দেশগুলো বিভক্ত থাকলে বাইরের শক্তিগুলো সহজেই তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি এমনকি স্পষ্ট করেছেন যে যৌথ নিরাপত্তার অর্থ সব দেশের পররাষ্ট্রনীতি এক হয়ে যাওয়া নয়। বরং ভিন্ন অবস্থান রেখেও একে অপরের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব কে সম্মান করা সম্ভব।
অর্থাৎ, এটি এখনই কোনো “ইসলামি ন্যাটো” তৈরির ঘোষণা নয়। বরং সেই ধরনের একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ধারণাগত ভিত্তি তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
পেজেশকিয়ান ফিলিস্তিন ইস্যুকে শুধু শিয়া-সুন্নি রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নয়, বরং নিপীড়িত মানুষের প্রতি দায়িত্বের জায়গা থেকে।
তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোকে এমন অবস্থান নিতে হবে যেখানে মানুষের সাহায্য করার আগে তার মাজহাব বা ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞেস করা হবে না। এর ফলে তাঁর “ইসলামি ঐক্য” ধারণাটি শুধু ইরানকেন্দ্রিক নিরাপত্তা নীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ফিলিস্তিন, গাজা এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবে এই ঐক্য কতটা সম্ভব?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার ৫৭টি সদস্যরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ এক নয়। কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, কোনো দেশ চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, কোনো দেশ রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে, আবার কেউ ইরানকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে।
শুধু শিয়া-সুন্নি বিভাজনই নয় – সৌদি আরব-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তুরস্কের নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থ, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নির্ভরতা এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক – সবকিছু মিলিয়ে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা নীতি তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন।
এমনকি OIC-এর মতো বিদ্যমান বহুপাক্ষিক কাঠামোও অনেক সময় সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন অবস্থানের কারণে শক্তিশালী ও বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাই পেজেশকিয়ানের প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে বাস্তব প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইরানের নিজের অবস্থান
এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রশ্নও উঠবে: ইরান নিজেই কি এমন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য অংশীদার? ইরানের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক গত কয়েক দশকে কখনো ঘনিষ্ঠ, কখনো উত্তেজনাপূর্ণ ছিল।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর তেহরানও বুঝতে পারছে যে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকিয়ে রাখা কঠিন। সেজন্যই পেজেশকিয়ানের বর্তমান বার্তায় একটি দ্বৈত অবস্থান দেখা যাচ্ছে – একদিকে প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার কথা, অন্যদিকে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কূটনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা।
তাহলে পেজেশকিয়ানের বার্তার আসল অর্থ কী?
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যকে তিনটি স্তরে দেখা যায়। প্রথমত, এটি ইরানের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা বার্তা। প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোর ভূখণ্ড যেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত না হয়।
দ্বিতীয়ত, এটি একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগ – ইরান তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর কাঠামোর বাইরে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। তৃতীয়ত, এটি ইসলামি বিশ্বের জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা।
শিয়া-সুন্নি, আরব-অনারব বা জাতীয় স্বার্থের পার্থক্য থাকলেও এসব পার্থক্য যেন মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সংঘাতে পরিণত না হয়। আর এখানেই তাঁর “আমরা ভাই, একে অপরের ওপর শাসক নই” বক্তব্যটির তাৎপর্য।
Watch Our Video On Muslim Sangbad YouTube channel ,click here
Source: Tasnim news




