সন্ত্রাসবাদের সূচকে পাকিস্তান বিশ্বসেরা! ইসরায়েল-আমেরিকার অবস্থানও চমকপ্রদ, ভারত ১৩ ও আফগান ১১ তম স্থান- GTI 2026 কী বলছে?
বিশ্বে সন্ত্রাসবাদের প্রভাব কোন দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি – এ প্রশ্নের নতুন একটি চিত্র সামনে এনেছে Global Terrorism Index 2026। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক Institute for Economics & Peace প্রকাশিত ২০২৬ সালের সূচকে ১৬৩টি দেশ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ৪২তম। বিপরীতে পাকিস্তান উঠে এসেছে বিশ্বের এক নম্বরে।
তবে এই তালিকার আরও কিছু অবস্থান বিশ্বকে হতবাক করেছে। তালিকায় পৃথিবীর সবচেয়ে সমালোচিত দেশ, ইসরায়েল রয়েছে ১০ম অবস্থানে। পশ্চিমা বিশ্ব যাকে সন্ত্রাসবাদের আতুরঘর বলে থাকে সেই আফগানিস্তান রয়েছে আফগানিস্তান ১১তম অবস্থানে
এদিকে আফগানিস্তানের সাথেই অবস্থান করছে প্রতিবেশি দেশ ভারত। তাদের অবস্থান ১৩তম। সম্প্রতি হিন্দুত্ববাদী হামলার ঘটনা বাড়াই তাদের অবনতি ঘটেছে। এদিকে বিশ্বগুরু যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে তালিকার ২৮তম অবস্থানে সাথে ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে জার্মানি রয়েছে। যাদের অবস্থান বাংলাদেশের ৪২ তম অবস্থানের চেয়েও খারাপ। তারা তালিকায় ২৯তম অবস্থানে রয়েছে।
অর্থাৎ তালিকাটি শুধু পাকিস্তান বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর গল্প নয়। বরং এটি দেখাচ্ছে – সন্ত্রাসবাদের প্রভাব এখনো দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে।
আগে বুঝে নেওয়া দরকার – GTI আসলে কী মাপে?
Global Terrorism Index কোনো দেশের জনগণকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে না। এমনকি কোনো দেশের সরকার সন্ত্রাসবাদে জড়িত কি না – এটিও সরাসরি মাপার সূচক নয়।
GTI মূলত একটি দেশে সন্ত্রাসবাদের প্রভাব কতটা, সেটি পরিমাপ করে। হামলার সংখ্যা, নিহত ও আহতের সংখ্যা, জিম্মি এবং এসব ঘটনার সামগ্রিক প্রভাবসহ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সূচক তৈরি করা হয়। তাই কোনো দেশ ১ নম্বরে থাকলে তার অর্থ হলো – সেই দেশে সন্ত্রাসবাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি; দেশের জনগণ বা কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসী বলা নয়।

বাংলাদেশের জন্য সুখবর: অবস্থান ৪২তম
২০২৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২.২৮৬ এবং অবস্থান ৪২তম। ২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশ ছিল ৩৫তম। অর্থাৎ র্যাংকিং সংখ্যায় ৩৫ থেকে ৪২ হওয়া বাংলাদেশের জন্য অনেক ভালো খবর। GTI-এর হিসাবে এটি সন্ত্রাসবাদের প্রভাব কমার ইতিবাচক পরিবর্তন।
IEP-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রভাব খুবই কম ছিল এবং আগের বছরের তুলনায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জন্য এই তথ্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ওপরের সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ।
কআন্তর্জাতিক পর্যায়ে মুসলিম দেশকে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান দেখাচ্ছে – একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও করতে পারে।
গাজার পক্ষে জাপানের টোকিওর রাস্তায় হাজার দিনের বেশি প্রতিবাদ করছেন- ইউসুকে ফুরুসাওয়া
তাহলে পাকিস্তান কেন বিশ্বের ১ নম্বরে?
এখানেই সূচকের সবচেয়ে বড় চমক। পাকিস্তান ২০২৬ সালের GTI-তে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসবাদের প্রভাবে আক্রান্ত দেশ হিসেবে শীর্ষে উঠেছে। দেশটির স্কোর ৮.৫৭৪। ২০২৫ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে ১,১৩৯ জন নিহত এবং ১,০৪৫টি হামলা রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটির খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান বিশেষভাবে আক্রান্ত হয়েছে।
এখানে মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। পাকিস্তান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কিন্তু সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যেও পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ রয়েছেন।
অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদকে ইসলাম বা মুসলমানদের সঙ্গে এক করে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। বরং পাকিস্তানের ঘটনাই দেখায়, সন্ত্রাসী সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্য অনেক সময় মুসলিম সমাজকেই দিতে হয়।

আফগানিস্তান: এখনো ঝুঁকিতে, কিন্তু উন্নতি করছে
আফগানিস্তান রয়েছে ১১তম অবস্থানে, স্কোর ৬.৬৭৮। দেশটি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসপ্রভাবিত দেশগুলোর একটি। কিন্তু এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন রয়েছে। আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদের প্রভাব ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
IEP-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদজনিত মৃত্যু প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে এবং হামলার সংখ্যাও কমে। অর্থাৎ পাকিস্তান ও আফগানিস্তান একই অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও তাদের বর্তমান প্রবণতা এক নয়।
ভারত ১৩তম -বাংলাদেশের চেয়ে ২৯ ধাপ ওপরে
ভারতের অবস্থান ১৩তম, স্কোর ৬.৪২৮। অর্থাৎ GTI-এর হিসাবে ভারতের ওপর সন্ত্রাসবাদের প্রভাব বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। ২০২৫ সালে ভারতের সন্ত্রাসী হামলাও কমেছে, তবে দেশটি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসপ্রভাবিত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে।
এখানে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষভাবে লক্ষণীয়। একই দক্ষিণ এশিয়া, একই অঞ্চলের নিরাপত্তা বাস্তবতা কিন্তু বাংলাদেশ ৪২তম, ভারত ১৩তম। তারপরও এই ভারতই বাংলাদেশে সংখ্যালগুদের ওপর অত্যাচারের কথা বলে। যেখানে তাদের দেশের অবস্থান এত খারাপ।
তাই বাংলাদেশের উন্নতিকে শুধু ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ’ হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবেও দেখা যায়। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান ও নেপালে সবচেয়ে কম সন্ত্রাসবাদ দেখা যায়। যা বাংলাদেশের জন্য অনেক প্রসংশনীয়।
এবার সবচেয়ে আলোচিত দুই দেশ: ইসরায়েল ও আমেরিকা
২০২৬ সালের GTI-তে ইসরায়েল ১০ম, স্কোর ৬.৭৯০। এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে গাজা যুদ্ধ ও ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের ধারাবাহিক প্রভাব পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
ইসরায়েলের ১০ম অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে – মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হামলা ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতা কীভাবে একটি দেশের নিরাপত্তা বাস্তবতাকে প্রভাবিত করে? এখানেই গাজার বাস্তবতা ফুটে উঠে।
যেখানে ইজরায়েল তালিকায় ১০ নম্বর অবস্থানে রয়েছে সেখানে ফিলিস্তিন ২২ নম্বর অবস্থানে রয়েছে। সাথে ইরান রয়েছে ১৮ নম্বর অবস্থানে। তারপরও ইজরায়েল ফিলিস্তিন কে সন্ত্রাসবাদের আতুরঘর বলে থাকে।
আমেরিকা ২৮তম – সন্ত্রাসবাদ শুধু মুসলিম বিশ্বের সমস্যা’ এই ধারণা কি টেকে?
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ২৮তম, স্কোর ৪.৫২১। এই সংখ্যাটি মুসলিম বিশ্বের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদকে মুসলিম বিশ্ব, ইসলামপন্থী সংগঠন এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত করে দেখা হয়েছে।
কিন্তু GTI-এর ২০২৬ সালের তালিকায় দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রও ২৮তম অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ কোনো একটি ধর্ম, জাতি বা অঞ্চলের একচেটিয়া সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহিংসতা, চরমপন্থী মতাদর্শ ও বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রভাব সূচকে প্রতিফলিত হয়েছে।
Watch Muslim sangbad Video On youtube
একটি তালিকা, কিন্তু দুই ধরনের বাস্তবতা
GTI-2026-এর এই কয়েকটি অবস্থান পাশাপাশি রাখলে চিত্রটি এমন:
দেশ
GTI 2026 অবস্থান
পাকিস্তান
১ম
ইসরায়েল
১০ম
আফগানিস্তান
১১তম
ভারত
১৩তম
ইরান
১৮ তম
ফিলিস্তিন
২২ তম
যুক্তরাষ্ট্র
২৮তম
জার্মানি
২৯তম
🇧🇩 বাংলাদেশ
৪২তম
এই তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে নিচে অর্থাৎ এই দেশগুলোর মধ্যে সন্ত্রাসবাদের প্রভাব সবচেয়ে কম বাংলাদেশের ওপর। অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থান একেবারে বিপরীত প্রান্তে। আর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ একটি বাস্তবতা সামনে আনে – সন্ত্রাসবাদকে শুধু মুসলিম বিশ্বের সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করা তথ্যভিত্তিকভাবে অসম্পূর্ণ।
মুসলমানদের জন্য এই সূচকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কী?
GTI-2026-এর তথ্য মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি দ্বিমুখী বার্তা দেয়। প্রথমত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো এখনো সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ দেখিয়েছে যে এই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।
পাকিস্তানের নিহতদের বড় অংশ পাকিস্তানেরই সাধারণ মানুষ। আফগানিস্তানেও একই বাস্তবতা। অর্থাৎ মুসলমানরা শুধু সন্ত্রাসবাদের অভিযুক্ত নয়; বিশ্বের বহু অঞ্চলে মুসলমানরাই সন্ত্রাসী সহিংসতার অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামনে এখন কী চ্যালেঞ্জ?
৪২তম অবস্থান নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। কিন্তু এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সন্ত্রাসবাদ কমে যাওয়ার পরও অনলাইন উগ্রবাদ, তরুণদের র্যাডিক্যালাইজেশন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন – এসব বিষয় নজরে রাখতে হবে।
কারণ একটি দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি একবার ভালো হলেই তা স্থায়ী হয়ে যায় না। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন হবে – GTI-তে আরও নিচের দিকে যাওয়া, অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদের প্রভাবকে আরও কমিয়ে আনা।
বাংলাদেশের জন্য তাই ৪২তম অবস্থান শুধু একটি র্যাংকিং নয় – এটি গত কয়েক বছরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির একটি পরিমাপ। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই অগ্রগতি ধরে রেখে আরও নিরাপদ অবস্থানে যেতে পারবে?
মূল উৎস: Institute for Economics & Peace (IEP), Global Terrorism Index 2026।




