ইসরায়েলের পাল্টা হুমকি: ওয়েস্ট ব্যাংক বসতি নিয়ে ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা হলে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা

ইসরায়েলের পাল্টা হুমকি: ওয়েস্ট ব্যাংক বসতি নিয়ে ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা হলে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা

ইসরায়েলের পাল্টা হুমকি: ওয়েস্ট ব্যাংক বসতি নিয়ে ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা হলে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা

মুসলিম সংবাদ : ওয়েস্ট ব্যাংকে বিতর্কিত ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাজ্য যদি বসতি সম্প্রসারণের কারণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে জবাবে ইসরায়েলও যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।

সারের এই মন্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন যে ওয়েস্ট ব্যাংকে বসতি সম্প্রসারণের প্রশ্নে যুক্তরাজ্য আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইসরায়েল নীতিতে একটি “ব্যাপক” বা “সম্পূর্ণ” নতুন পদক্ষেপের প্যাকেজ ঘোষণা করবে।

গিডিয়ন সারের সরাসরি সতর্কবার্তা

হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গিডিয়ন সার বলেন, যুক্তরাজ্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে ইসরায়েলও নীরব থাকবে না।

তার ভাষায়, যুক্তরাজ্য যদি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে ইসরায়েলও যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, ইসরায়েলের কাছে প্রয়োজনীয় “টুলস” রয়েছে এবং ব্রিটিশ পদক্ষেপের জবাব দেওয়ার জন্য দেশটি প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তবে ইসরায়েল ঠিক কী ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, সে বিষয়ে সার বিস্তারিত বলেননি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে ইসরায়েলি সরকারের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, তবে কোনো নির্দিষ্ট পাল্টা পদক্ষেপ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

ইসরায়েলের পাল্টা হুমকি: ওয়েস্ট ব্যাংক বসতি নিয়ে ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা হলে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা

যুক্তরাজ্য কী করতে পারে?

এড মিলিব্যান্ড ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বলেছেন, ইসরায়েলের বসতি নীতির বিষয়ে যুক্তরাজ্যের বর্তমান অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি “comprehensive set of measures” ঘোষণা করা হবে।

মিলিব্যান্ড বিশেষভাবে বলেছেন, ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো যাতে নতুন বসতি নির্মাণে অর্থায়ন, নির্মাণকাজ বা বিজ্ঞাপনের সঙ্গে যুক্ত না হয়, সে বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। তবে ওয়েস্ট ব্যাংকের বসতি থেকে আসা সব পণ্যের ওপর সম্পূর্ণ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

ইরান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালী: মিডিয়া কি সত্যিই ইরানের ‘মিত্র’? স্কট বেসেন্টের অভিযোগের নেপথ্যে কী

বিষয়টি নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের ভেতরে আলোচনা চলছে। যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে ব্যবসায়িক নির্দেশনা হালনাগাদ করে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবৈধ বসতিগুলোতে অর্থনৈতিক ও আর্থিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ E1 বসতি প্রকল্প?

বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে ওয়েস্ট ব্যাংকের বিতর্কিত E1 এলাকা, যা পূর্ব জেরুজালেম ও মা’আলে আদুমিম বসতির মধ্যবর্তী একটি কৌশলগত অঞ্চল।

ইসরায়েলি সরকার সম্প্রতি ওই এলাকায় নতুন আবাসন প্রকল্পের জন্য টেন্ডার প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ টেন্ডারে প্রায় ১,২০০-এর বেশি আবাসিক ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাজ্য বলছে, E1 এলাকায় বড় ধরনের বসতি সম্প্রসারণ বাস্তবায়িত হলে ওয়েস্ট ব্যাংকের ভৌগোলিক সংযোগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পূর্ব জেরুজালেম ও ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগের সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের মতে, এটি দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

ইসরায়েলের পাল্টা হুমকি: ওয়েস্ট ব্যাংক বসতি নিয়ে ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা হলে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা

আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে বিরোধ

যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশের অবস্থান হলো, দখলকৃত ওয়েস্ট ব্যাংকে ইসরায়েলি বসতি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ। ব্রিটিশ সরকার E1 প্রকল্পকে “অগ্রহণযোগ্য” ও “ধ্বংসাত্মক” বলে বর্ণনা করেছে।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালিসহ একাধিক দেশ সম্প্রতি যৌথভাবে E1 প্রকল্পের বিরোধিতা করেছে এবং বলেছে, এই প্রকল্প ওয়েস্ট ব্যাংকের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এসসিও সম্মেলনে ফিলিস্তিন ইস্যুতে পাকিস্তান-তুরস্কের জোরালো অবস্থান, মক্কা জোটের উল্লেখ কেন গুরুত্বপূর্ণ

অন্যদিকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে বসতি ও ভূখণ্ড প্রশ্নে নিরাপত্তা, ঐতিহাসিক দাবি এবং নিজেদের জাতীয় স্বার্থের যুক্তি তুলে ধরে আসছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও ইসরায়েলি সরকারের অবস্থানের মধ্যে এই প্রশ্নে মৌলিক মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

কেন ব্রিটেন-ইসরায়েল সম্পর্ক নতুন চাপের মুখে?

গিডিয়ন সার দাবি করেছেন, ব্রিটিশ সরকারের সম্ভাব্য পদক্ষেপের পেছনে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনাও কাজ করছে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান ব্রিটিশ নীতি ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।

ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য এর আগেও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা রপ্তানি সম্পর্কিত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই পটভূমিতে নতুন অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সামনে কী হতে পারে?

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাজ্য আগামী কয়েক সপ্তাহে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ ঘোষণা করে। যদি লন্ডন শুধু ব্যবসায়িক নির্দেশনা কঠোর করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া এক ধরনের হতে পারে।

মুসলিম সংবাদ ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন 

কিন্তু বসতি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য, বিনিয়োগ বা কোম্পানির কার্যক্রমের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে ইসরায়েলের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে। গিডিয়ন সারের বক্তব্য স্পষ্ট করেছে যে, ইসরায়েল সম্ভাব্য ব্রিটিশ পদক্ষেপকে শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা হিসেবে দেখছে না; বরং এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রস্তুতির কথাও প্রকাশ্যে বলছে।

ওয়েস্ট ব্যাংকের E1 প্রকল্প নিয়ে এই বিরোধ তাই শুধু একটি বসতি নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের সম্ভাবনা, দুই-রাষ্ট্র সমাধান এবং যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল কূটনৈতিক সম্পর্ক—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে একই সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।

আগামী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের ঘোষিত পদক্ষেপ এবং তার পর ইসরায়েলের সম্ভাব্য পাল্টা সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, এই কূটনৈতিক বিরোধ কতটা বড় সংঘাতে রূপ নেয়।

মুসলিম সংবাদ – মুসলিম উম্মাহর কন্ঠস্বর

Share on Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।