মোদিকে ভগবান সাজিয়ে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের পূজা – বিহারে তৈরি করা হবে মোদির নামে মন্দির
ভারত: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ভগবান সাজিয়ে তার নামে মন্দির নির্মাণের একটি প্রস্তাব দিয়েছে তার ভক্ত সমর্থক। সাথে দিল্লিতে তাঁর নামে ‘চালিসা’ পাঠ ও আরতির আয়োজন করা হয়। যেখানে মোদিকে ভগবান সাজিয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। আর এবিষয় ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সমালোচনা।
বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে একটি ভিডিও প্রকাশের পর, যেখানে বিহার স্টেট ট্রান্সজেন্ডার ওয়েলফেয়ার বোর্ডের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিত রাজন সিং মোদীকে ‘ভগবান’ এবং ‘লর্ড শ্রী নরেন্দ্র মোদী জি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো – মন্দির নির্মাণের প্রস্তাব বোর্ড পর্যায়ে অনুমোদিত হলেও এখনো বিহার সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রকল্প হিসেবে জমি বা অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হবে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। যেহেতু সেখানে মোদির দলের মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতায় রয়েছে তাই অনুমতি পাওয়া সময়ের বিষয় বলে দাবি করা হচ্ছে।
কী রয়েছে মন্দিরের প্রস্তাবে?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিহার সরকারের সমাজকল্যাণ দফতরের অধীন স্টেট ট্রান্সজেন্ডার ওয়েলফেয়ার বোর্ডের বৈঠকে মোদীর নামে মন্দির তৈরির প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত রাজন সিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের জন্য একটি মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই তাঁর নামে মন্দির তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত মন্দিরের জন্য প্রায় পাঁচ একর জমি এবং আনুমানিক ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। সেখানে মোদীর একটি জীবন-আকারের মূর্তি স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে এসব পরিকল্পনা এখনো প্রস্তাবের পর্যায়েই রয়েছে- সরকারি অর্থ বা জমি বরাদ্দের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
কেন মোদীকে কেন্দ্র করে এই উদ্যোগ?
রাজন সিংয়ের ব্যাখ্যা হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের সময় ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার ও স্বীকৃতি নিয়ে আইনগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই কারণে সম্প্রদায়ের একটি অংশ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাইছে। এই যুক্তি থেকেই মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনাকে তাঁরা সম্মানের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন।
কিন্তু বিতর্কের জায়গাটি তৈরি হয়েছে অন্য কারণে। একজন জীবিত রাজনৈতিক নেতাকে সরাসরি ‘ভগবান’ হিসেবে অভিহিত করা এবং তাঁর নামে মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যক্তিপূজা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দেবত্ব দেওয়ার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
ভাইরাল ভিডিওতে কী বলা হয়েছে?
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রাজন সিংকে মোদীর উদ্দেশে ‘লর্ড শ্রী নরেন্দ্র মোদী জি’ এবং ‘ভগবান’ শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়।
ভিডিওতে তিনি মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল যুক্তি – যেহেতু মোদী ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের অধিকার ও মর্যাদার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন বলে তাঁরা মনে করেন, তাই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মন্দির নির্মাণে আপত্তির কারণ নেই। এখানেই বিষয়টি সাধারণ একটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
দিল্লিতে ‘মোদি চালিসা’ – বিতর্ক আরও বাড়ল
এর মধ্যেই ২০ আগস্ট নয়াদিল্লির প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ার একটি হলে মোদীকে কেন্দ্র করে আরেকটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তাঁর কাটআউটকে ধনুক হাতে শ্রীরামের আদলে সাজানো হয় এবং ‘ভগবান শ্রী নরেন্দ্র মোদি চালিসা’ পাঠ ও আরতির আয়োজন করা হয় বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানটি প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ার আয়োজিত ছিল না। ক্লাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হলটি প্রেস কনফারেন্সের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছিল এবং ভাড়ার শর্ত ভঙ্গ হওয়ায় তারা হস্তক্ষেপ করে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। তবে অনুষ্ঠানের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়।
সমালোচনার জায়গা কোথায়?
সমালোচকদের মূল প্রশ্ন হলো – গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সম্মান করা এবং তাঁকে ধর্মীয় অর্থে ‘ভগবান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে অনেকে এটিকে ব্যক্তি পূজার চরম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, কোনো রাজনৈতিক নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে মন্দির নির্মাণ বা ধর্মীয় উপাসনার ভাষা ব্যবহার কতটা যুক্তিসঙ্গত।
অন্যদিকে উদ্যোগের সমর্থকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের মতে, এটি কোনো সরকারি ধর্মীয় কর্মসূচি নয়; বরং ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের একটি অংশের ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ।
অর্থাৎ বিতর্কের কেন্দ্র শুধু ‘মোদীর মন্দির হবে কি না’ – এটি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতীক, ব্যক্তিপূজা এবং একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অধিকার – এই চারটি বড় প্রশ্ন।
এখনো কি মন্দির নির্মাণ নিশ্চিত?
না। এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। বোর্ডের বৈঠকে প্রস্তাব অনুমোদিত হওয়া এবং বিহার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মন্দির নির্মাণের জন্য জমি ও অর্থ বরাদ্দ করা – দুটি এক বিষয় নয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখনো সরকারি পর্যায়ে চূড়ান্ত জমি বরাদ্দ বা ১১২ কোটি টাকা অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি। ফলে এই মুহূর্তে এটিকে ‘বিহার সরকারের মোদী মন্দির নির্মাণ প্রকল্প’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না।
বরং বলা যায়, এটি একটি বোর্ড-সমর্থিত প্রস্তাব, যার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে পরবর্তী সরকারি অনুমোদনের ওপর। কিন্তু ক্ষমতায় যেহেতু বিজেপি সরকার রয়েছে তাই অনুমতি পাওয়া বড় কিছু না, এমনই দাবি তাদের।
মোদীর নামে মন্দির নির্মাণের এই প্রস্তাব ভারতের রাজনীতিতে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ভক্তি ও আনুগত্যের সংস্কৃতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এটিকে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন; অন্যদিকে সমালোচকেরা জীবিত রাজনৈতিক নেতাকে দেবতার মর্যাদা দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মন্দিরের প্রস্তাব এখনো বাস্তবায়িত সরকারি প্রকল্প নয়। কিন্তু ভিডিওতে ‘ভগবান’ ও ‘লর্ড শ্রী নরেন্দ্র মোদী জি’ ধরনের সম্বোধন এবং দিল্লির ‘মোদি চালিসা’ অনুষ্ঠান – দুটি ঘটনাই বিষয়টিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের বড় ইস্যুতে পরিণত করেছে।
Muslim Sangbad এর সকল ভিডিও দেখুন এখানে ক্লিক করুন।
Source : Indian Media




