ইরান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালী: মিডিয়া কি সত্যিই ইরানের ‘মিত্র’? স্কট বেসেন্টের অভিযোগের নেপথ্যে কী

মিডিয়া কি সত্যিই ইরানের ‘মিত্র’
ইরান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালী: মিডিয়া কি সত্যিই ইরানের ‘মিত্র’? স্কট বেসেন্টের অভিযোগের নেপথ্যে কী

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত যতটা সামরিক ও অর্থনৈতিক, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তথ্যের লড়াই। এরই মধ্যে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, ইরানের অন্যতম বড় ‘মিত্র’ হলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। তাঁর অভিযোগ, ইরান যেসব দাবি করছে, সেগুলো যথাযথভাবে যাচাই না করেই কিছু গণমাধ্যম দ্রুত প্রকাশ করে দিচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে মাইন পাতা এবং দুটি জাহাজ মাইনে আঘাত পাওয়ার দাবি নিয়ে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন।

বেসেন্টের বক্তব্যের মূল কথা হলো হরমুজ প্রণালীতে কোনো মাইন নেই এবং দুটি জাহাজও মাইনে আঘাত পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ডও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে। তবে ঘটনাটিকে শুধু ‘কে সত্য বলছে, কে মিথ্যা বলছে’ এভাবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা কঠিন। কারণ হরমুজ প্রণালী ঘিরে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি এখানে চলছে তথ্য, প্রচারণা এবং বাজার-মনস্তত্ত্বের লড়াইও।

হরমুজ প্রণালী এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মতো জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ।

বিশ্বের সামুদ্রিক তেল সরবরাহের বড় একটি অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো জাহাজ মাইনে পড়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনে আক্রান্ত হয়েছে, কিংবা নিরাপত্তার কারণে কোনো রুট এড়িয়ে চলছে এমন খবর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেলের দাম ও বীমা খরচে প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণেই হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বক্তব্য শুধু সামরিক তথ্য নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি।

মাইন নিয়ে আসলে বিরোধটা কোথায়?

সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা IRGC-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, হরমুজের দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি রুটে একটি সুপারট্যাঙ্কার নৌ-মাইনে আঘাত পেয়েছে। ইরানি পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, দুটি মাইনের আঘাতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং সেটি থেমে যায়।

এই দাবি প্রকাশের পরপরই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা CENTCOM তা প্রত্যাখ্যান করে। মার্কিন পক্ষের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালীতে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ মাইনে আঘাত পাওয়ার ঘটনা ঘটেনি।

এখানেই তৈরি হয়েছে মূল বিতর্ক। কারণ একই সময়ে সমুদ্র নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে হরমুজ এলাকায় তেলবাহী জাহাজের ওপর হামলা বা প্রজেক্টাইল আঘাতের মতো ঘটনার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার খবর এবং ‘মাইনে আক্রান্ত হওয়ার’ খবর এক বিষয় নয়।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলেই সেটি মাইনে পড়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌযান থেকে হামলা, বিস্ফোরক কিংবা অন্য কোনো কারণে একই ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তাই ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন।

তাহলে স্কট বেসেন্ট কেন মিডিয়াকে দায়ী করছেন?

বেসেন্টের অভিযোগ মূলত তথ্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। তাঁর যুক্তি, ইরানের কোনো দাবি যদি যাচাই ছাড়াই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেটি শুধু সংবাদ থাকে না; তা ইরানের প্রচারণার অংশ হিসেবেও কাজ করতে পারে।

বিশেষ করে যুদ্ধের সময় একটি দাবি প্রকাশের গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গণমাধ্যম প্রথমে একটি পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করল, পরে সেটি ভুল প্রমাণিত হলো—ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে তথ্যটি বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। কোনো রাষ্ট্রের সামরিক বক্তব্যকে শুধু রাষ্ট্রীয় দাবি হিসেবে গ্রহণ করাও সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র যেমন ইরানের মাইন-সংক্রান্ত বক্তব্যকে ‘ডিসইনফরমেশন’ বলছে, তেমনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এসসিও সম্মেলনে ফিলিস্তিন ইস্যুতে পাকিস্তান-তুরস্কের জোরালো অবস্থান, মক্কা জোটের উল্লেখ কেন গুরুত্বপূর্ণ

অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু ‘মিডিয়া ইরানের কথা বলছে কি না’ এমন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, যুদ্ধের সময় কোনো পক্ষের দাবি কতটা স্বাধীন প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।

এটি কি শুধু সামরিক সংঘাত, নাকি তথ্যযুদ্ধও?

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে তথ্যযুদ্ধের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সামরিক সংঘাতে কোনো পক্ষ যদি দাবি করে যে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করছে, তাহলে সেই দাবির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে।

ইরান যদি দেখাতে পারে যে হরমুজে জাহাজ চলাচল তার অনুমতি বা নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে ঝুঁকির ধারণা বাড়তে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যদি দেখাতে পারে যে আন্তর্জাতিক শিপিং লেন নিরাপদ এবং তাদের বাহিনী সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম, তাহলে ওয়াশিংটনের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হয়।

মিডিয়া কি সত্যিই ইরানের ‘মিত্র’

তাই একটি জাহাজ কোথায়, কীভাবে এবং কেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই প্রশ্নের উত্তর কেবল সামরিক তথ্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাজার, কূটনীতি এবং যুদ্ধের মনস্তত্ত্ব।

যুক্তরাষ্ট্র কী দাবি করছে?

মার্কিন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা হরমুজ প্রণালীর আন্তর্জাতিক শিপিং লেন থেকে মাইন সরানোর কাজ করেছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা এটিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ওয়াশিংটনের বৃহত্তর বক্তব্য হলো, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে চাপের মধ্যে রাখা এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন চালু রাখা।

অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের অর্থনৈতিক বক্তব্যও এই কৌশলের সঙ্গে যুক্ত। তিনি ইরানের অর্থনীতিকে গুরুতর চাপের মধ্যে থাকা একটি ‘ডেথ স্পাইরাল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ইরানের অবস্থান কী?

তেহরান অন্যদিকে হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের প্রভাব ও সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরছে। ইরানের জন্য এই জলপথ শুধু অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর কৌশলগত চাপ প্রয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তাই হরমুজে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের প্রতিটি বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পাল্টা বক্তব্যও বিশ্ববাজার ও আন্তর্জাতিক জনমতের ওপর প্রভাব ফেলে।

এই কারণে কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে ঘটনাগুলোর স্বাধীন প্রমাণ, স্যাটেলাইট তথ্য, জাহাজের গতিপথ, ক্ষয়ক্ষতির ধরন এবং সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য যাচাই করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তেলের বাজার কেন এত উদ্বিগ্ন?

হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যায় জ্বালানি বাজারে। কারণ এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।

জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়লে শুধু তেলের সরবরাহ নয়, পরিবহন ও বীমা ব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে সরাসরি তেল উৎপাদন কমে না গেলেও বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। আর সেই আশঙ্কাই অনেক সময় দাম বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট।

বেসেন্টের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, ভবিষ্যতে পাইপলাইনসহ বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি হলে হরমুজের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা কমানো সম্ভব। তাঁর যুক্তি, তখন এই জলপথের কৌশলগত গুরুত্ব অনেকটাই কমে যেতে পারে।

আমাদের ভিডিও দেখুন, ক্লিক করুন 

তবে বাস্তবে হরমুজের বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়। পাইপলাইন অবকাঠামো, উৎপাদনক্ষমতা, বন্দর সুবিধা, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। তাই স্বল্পমেয়াদে হরমুজের গুরুত্ব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও বাস্তবসম্মত নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা: যুদ্ধের সময় তথ্য যাচাই

হরমুজ প্রণালী নিয়ে বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। একটি পক্ষ বলছে মাইন নেই, অন্য পক্ষ বলছে মাইন হামলা হয়েছে। আবার কিছু প্রতিবেদনে জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার কথা থাকলেও আক্রমণের ধরন নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হলো কোনো পক্ষের বক্তব্যকে নিজের প্রতিবেদনে ‘প্রমাণিত সত্য’ হিসেবে উপস্থাপন না করে স্পষ্টভাবে বলা কে কী দাবি করেছে এবং সেই দাবির স্বাধীন প্রমাণ কী আছে।

একই নিয়ম রাষ্ট্রীয় সামরিক বিবৃতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ যুদ্ধের সময় প্রতিটি পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য তথ্য ব্যবহার করে।

স্কট বেসেন্টের ‘ইরানের অন্যতম সেরা মিত্র মিডিয়া’ মন্তব্য মূলত যুদ্ধকালীন তথ্যপ্রবাহ নিয়ে মার্কিন অসন্তোষকে প্রকাশ করে। হরমুজ প্রণালীতে মাইন থাকার দাবি এবং জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী।

কিন্তু এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোনো একটি পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা নয়, বরং দাবিগুলো কতটা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যাচ্ছে। কারণ হরমুজ প্রণালীতে একটি জাহাজের ক্ষতিও আন্তর্জাতিক তেলবাজার, বীমা খরচ, সামরিক কৌশল এবং জনমতের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সুতরাং হরমুজের ঘটনাকে শুধু ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি একই সঙ্গে সামরিক সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ এবং তথ্যযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যেখানে একটি খবরের সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্বও অনেক বেশি।

Share on Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।