আজারবাইজানে হিজাব নিয়ে বিতর্ক কেন? স্কুলের নতুন পোশাকবিধি, ছাত্রীদের প্রতিবাদ ও ৩৭ জন গ্রেপ্তারের ঘটনা | Full Explained

আজারবাইজানে হিজাব নিয়ে বিতর্ক কেন?

আজারবাইজানে হিজাব নিয়ে বিতর্ক কেন?

একটি মেয়ে স্কুলে পড়তে চায়। তার পরীক্ষার ফল ভালো, সে নিয়মিত পড়াশোনা করে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, মাথায় হিজাব থাকার কারণে তাকে স্কুলে ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ঘটনাটি বাংলাদেশের নয়, ভারতেরও নয়। এটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আজারবাইজানের ঘটনা।

নতুন পোশাকবিধি ঘিরে সেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়েছে, প্রতিবাদ হয়েছে। এই প্রতিব্দের জন্য ১২ অক্টোবর দেশটির রাজধানী বাকুতে ৩৭ জনকে গ্রেপ্তারের খবর এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্কুলের পোশাকের একরূপতা বজায় রাখা আর ধর্মীয় স্বাধীনতা সীমিত করা – এই দুটির মধ্যে সীমারেখা কোথায়? কেন ৯৬ শতাংশ মুসলিম দেশ হওয়া সত্বেও তারা হিজাব নিষিদ্ধ করছে?  এবিষয়ে সরকারের অবস্থা কি? কেন মুসলিম দেশগুলোতেই ইসলামের বিধান অনুসারে বাঁধা? কেন মুসলিমরাই ইসলামের বিধান অনুসরণ করতে চাইনা?

আজারবাইজানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক  বিতর্ক

আজারবাইজান কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। দেশটিতে সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ৯৬ শতাংশও মুসলিম যার মধ্যে অধিকাংশ মুসলিম শিয়া মতাবলম্বী। আর বাকি মানুষ সুন্নি মুসলিম সহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের।

তবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া মানেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ধর্মভিত্তিক – এমন নয়। এত মুসলিম থাকা সত্বেও তারা ইসলামিক দেশ নয়। আজারবাইজান একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর দেশটির  রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও ধর্ম পৃথক করা হয়। আর তখন থেকেই দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধর্ম নিরেপক্ষতা রয়েছে।

আজারবাইজানে হিজাব নিয়ে বিতর্ক কেন?

এখানেই বর্তমান বিতর্কের মূল বিষয়। সরকার বলছে, সরকারি বিদ্যালয়ে পোশাকের নিয়ম এবং শিক্ষার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখা প্রয়োজন। অন্যদিকে হিজাব পরা ছাত্রী ও তাঁদের সমর্থকদের প্রশ্ন – ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে কেন কারও ধর্মীয় পোশাক বাধা হয়ে দাঁড়াবে?

নিউইয়র্কের মাঝেই আলাদা এক জগত: হাসিদিক ইহুদিদের ৪৮ ঘণ্টার জীবনে রুহি চেনেত যা দেখলেন

আজারবাইজানের নতুন নিয়মে কী বলা হয়েছে?

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, আজারবাইজানের মন্ত্রিপরিষদ সরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পোশাকসংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তন আনে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সিদ্ধান্তটির নম্বর ৩০৯ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন বিধিতে এমন পোশাক পরতে বলা হয়েছে যা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দিবে। মুলত পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক পরার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই আইনে কৌশলে সবকিছু পরিবর্তন করার অভিযোগ উঠেছে। কারণ আইনে কোনো জায়গায় হিজাব নিষিদ্ধের কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু বিদ্যালয়ে গেলে হিজাব পরা দেখলেই তাকে ক্লাস থেকে বের করে দেবার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি শিক্ষকরাই ভিডিও করে তার প্রমাণ দিয়েছে।

এরপর ৬ অক্টোবর শিক্ষকদের পোশাক নিয়েও পৃথক নিয়ম অনুমোদন করা হয়। সিদ্ধান্ত নম্বর ৩২৫ অনুযায়ী, সরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পোশাক হতে হবে পরিপাটি, পেশাগত পরিবেশের উপযোগী এবং শিক্ষার ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এর পর কিছু হিজাব পরা শিক্ষিকা পোশাক পরিবর্তন করতে অথবা চাকরি ছাড়তে চাপ পাওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। অর্থাৎ, বিতর্কটি এখন শুধু ছাত্রীদের পোশাকে সীমাবদ্ধ নেই; শিক্ষকদের পেশাগত অধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

একটি ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আল-জাজিরার প্রকাশ পেয়েছে। যেখানে দেখা যাচ্চে, কয়েকজন হিজাব পরা শিক্ষার্থাী ও একজন হিজাব পরা শিক্ষিকা স্কুলের বাইরে রাস্তায় ক্লাস করছেন। তাদের দাবি হিজাব পরার কারণে তাদের বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবাদ, গ্রেপ্তার ও দুই পক্ষের যুক্তি

সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে আজারবাইজানের বিভিন্ন এলাকায় নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভের খবর প্রকাশিত হতে থাকে। বাকুর বালাখানি এলাকার ৬৯ নম্বর বিদ্যালয়ের সামনে প্রতিবাদকারীদের হাতে একটি ব্যানার দেখা যায়। তাতে লেখা ছিল, – ‘হিজাব শিক্ষার অন্তরায় নয়।’

কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জনের খবরও এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে হিজাব পরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ঘিরে আবেগপূর্ণ দৃশ্য দেখা গেছে। তবে প্রতিটি ভিডিওর স্থান, সময় ও প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

আজারবাইজানে হিজাব নিয়ে বিতর্ক কেন?

১২ অক্টোবর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। আজারবাইজানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো একটি খবর প্রকাশ করে৷ যেখানে বলা হয়েছে,  বাকুতে পোশাকবিধি বাস্তবায়ন ঘিরে সংঘর্ষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগে ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি বিদ্যালয়ের পরিচালকের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

Watch Muslim sangbad youtube channel

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এক বিষয়; আর সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ বা অন্যের নিরাপত্তা বিপন্ন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অভিযোগের বিচার হতে হবে প্রমাণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।

এবার আসা যাক দুই পক্ষের যুক্তিতে।

সরকারের সমর্থকদের বক্তব্য, বিদ্যালয়ের পোশাকবিধি সবার জন্য অভিন্ন হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মীয় ও সামাজিক পার্থক্য কম দৃশ্যমান থাকবে। এতে একটি নিরপেক্ষ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব।

কিন্তু এর বিপরীতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সমর্থকেরা বলছেন, হিজাব পরা মানেই শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করা নয়। কেউ নির্ধারিত পোশাকের সঙ্গে হিজাব পরেও নিয়ম মেনে ক্লাস করতে পারেন। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাঁকে শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া সমস্যার সমাধান নয়।

তাদের দাবি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশে ৯৬ শতাংশও মুসলিম তাহলে কাদের জন্য নিরেপক্ষ পোশাক পরতে বলা হচ্ছে। ওই ৪ শতাংশ ইহুদি সহ অন্যান্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর জন্য? যেখানে সবাই মুসলিম তাহলে তাদের ধর্মীয় অনুভূতি আলাদা করার কি কারণ? এখানে মূল প্রশ্ন শুধু পোশাকের নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নিয়ম প্রয়োগের ফলে কোনো শিক্ষার্থী তার শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হারাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্মীয় স্বাধীনতা

ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ এবং তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি সব দেশে এক রকম নয়। কোনো রাষ্ট্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার পৃথক অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়। আবার ধর্মীয় স্বাধীনতার আলোচনায় ব্যক্তির বিশ্বাস প্রকাশের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই শুধু ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি ব্যবহার করলেই কোনো বিধিনিষেধ ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। দেখতে হবে, নিয়মটি কতটা প্রয়োজনীয়, সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না। এর ফলে শিক্ষার অধিকার অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না। অন্যদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার দাবিও জননিরাপত্তা বা অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের অনুমতি দেয় না।

আজারবাইজানের এই বিতর্কে তাই তিনটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: হিজাব কি নির্ধারিত বিদ্যালয়ের পোশাকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরা সম্ভব? শিক্ষার্থীদের স্কুলে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে কী আইনি ভিত্তি দেখানো হচ্ছে? আর শিক্ষার অধিকার বজায় রেখে সমস্যাটির কোনো কম কঠোর সমাধান সম্ভব কি না? আর হিজাবই কেন স্কুল পোশাক করা হচ্ছে না? যদি করা হয় তাহলে তো অটো ৯৬ শতাংশ একই পোশাক হয়ে যায়?এসব প্রশ্নের উত্তরই দেখাবে, রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবে কতটা ন্যায়সংগত।

আজারবাইজানের হিজাব বিতর্ক আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কি ধর্মীয় পরিচয়কে সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে রাখবে। নাকি সেই পরিচয় বজায় রেখেও সবার জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করবে?

আপনার মতে, বিদ্যালয়ের নির্ধারিত পোশাকবিধি মেনে হিজাব পরার সুযোগ থাকা উচিত কি না? আর কেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেই হিজাব নিষিদ্ধ হচ্ছে?  তাহলে ভারতের মত দেশগুলোতে তো হিজাব সম্পর্কে কথা উঠবেই?  যুক্তিসহ আপনার মতামত মন্তব্যে জানান।

মুসলিম সংবাদ – মুসলিমের কথা বলে।

Share on Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।