রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলাদেশের মানুষ এত ভালোবাসে কেন? জাতীয় সংগীত, ইতিহাস ও বিতর্কের নেপথ্যে
পৃথিবীর একমাত্র দেশ যাদের জাতীয় সংগীতে সেই দেশেরই নাম নেই। পৃথিবীর একমাত্র দেশ যার জাতীয় সংগীত লেখা হয়েছিলো, যখন সেই দেশের অস্তিত্ব ছিলো না। তারপরও কিভাবে একটি ‘গান’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হলো? যে গান লেখার উদ্দেশ্যও ছিলো ভিন্ন। তারপরও কেন ও কিভাবে সেই গানই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হলো?
এমনকি গান টির লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনোও চাইনি বাংলাদেশ নামে কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হোক। এছাড়াও তিনি তৎকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির বিপক্ষেও ছিলেন। এতকিছু হওয়া সত্বেও কিভাবে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ঠাকুর প্রীতি ঢুকিয়ে দেওয়া হলো? সত্যিই কি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করা উচিত?
যে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের প্রধান চরিত্র নিয়ে উপহাস করলেও তাকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা নজিরহীন। কিন্তু সেই দেশে রবীন্দ্রন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ছবির মুখে কালো কালি দেবার জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়৷
কিভাবে বাংলাদেশের জনগণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো এই রবীন্দ্র প্রীতি, যে তারা তাদের ধর্মের নবির থেকেও তাকে বেশি আগলিয়ে রাখে। কেন বাংলাদেশের জনগণ রবিন্দনাথ ঠাকুর কে এতবেশী ভালোবাসে। চলুন এ-সব কিছু বিস্তারিত জানি Muslim Sangbad এর আজকের প্রতিবেদনে৷

Iরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের ইতিহাস
I
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন কিংবদন্তী : কেন বাংলাদেশের জনগণ তাকে এত ভালোবাসে?
অনেকে বলে লেজেন্ড বা কিংবদন্তি কখনো মরে না। রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জ্বলন্ত উদাহরণ। বাংলাদেশে একজন জীবিত ব্যক্তির মুখে কালি দিলেও তাকে রিমান্ড দেওয়া হয়না। কিন্তু একজন মৃত ব্যক্তির, রাস্তার পাশে আঁকানো একটি ছবিতে কালি দিলেও রিমান্ডে নেওয়া হয়। এদ্বারা বোঝা যায়, রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর মরে নায়। তিনি এখনো জীবিত রয়েছে হাজারো বাঙালির অন্তরে।
তাহলে হঠাৎ কি এমন হলো যে বাংলাদেশের কিছু জনগণ তাকে ভুলে যেতে চাইছে?
একজন মহিলা সম্প্রতি রবী ঠাকুরের একটি ছবি, যেটি রাস্তার পাশে দেওয়ালে ছিলো। সেটা কালো রং দিয়ে মুছে ফেলতে যায়। এ ঘটনার পর তাকে বাংলাদেশ পুলিশ গ্রেপ্তার করেন। ও পরে তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয় ও বর্তমান তিনি আইনের আওতাধীন রয়েছেন৷
কিন্তু এই ঘটনার পরে অনেকে আটক হওয়া মহিলার পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন। অনেকের মন্তব্য, যে ব্যক্তি বাংলাদেশ চাইনি, যে ব্যক্তি তৎকালীন সময় পুর্ব বাংলার জনগণের উন্নতি চাইনি। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হোক তারও বিরোধী করতেন।
এমন ব্যক্তিকে কেন বাংলাদেশের মানুষই এভাবে ভালোবাসতে পারে। এছাড়াও ঠাকুর প্রেকিকেরা দাবি করেছেন, রুবিন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন হিন্দু বলে তাকে কিছু পাকিস্তান পন্থী মুসলিম পছন্দ করে না।
সত্যিই কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশ তৈরির বিপক্ষে ছিলেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৪১ সালে মারা যান অর্থাৎ তিনি ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়াো দেখে যেতে পারেননি। তাহলে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ভাগ হওয়া বা বাংলাদেশ না চাওয়ার প্রশ্নও ওঠে না।
তাহলে কেন তার নামে এমন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে? আসলে তৎকালীন সময় ইংরেজরা ভারত উপমহাদেশে ‘ভাগকর শাসন কর’ নীতি অবলম্বন করেন। যারফলে অখণ্ড বাংলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ নামে অখণ্ড বাংলা ভাগ করা হয়। সে সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নীতির চরম বিরোধিতা করেন। তিনি কখনোও চাননি অখণ্ড বাংলা বিভক্ত হোক। এর প্রতিবাদ তিনি ১৯০৫ সালে আমার ‘আমার সোনার বাংলা ‘ গানটি লেখেন
Muslim Sangbad Video Watch Now
যেহেতু তিনি বাংলা বিভক্ত করতে চাইনি। তাই বর্তমান বাংলাদেশ তৈরি হবার কোনো সম্ভবনাই ছিলো না। যদি দুই বাংলা ভাগ না হত, তাহলে একটি বাংলা ভারত ও আর একটি বাংলা পাকিস্তান পেত না। আর পাকিস্তান পূর্ব বাংলা না পেলে বর্তমান বাংলাদেশও হতো না। এই লজিক কাজে লাগিয়ে অনেকে বলে তিনি বাংলাদেশ চাননি।
কিন্তু অভিযোগ আছে, তিনি তৎকালীন সময়ে পূর্ব বাংলা অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের উন্নয়নে বাঁধা সৃষ্টি করতো। তিনি পূর্ব বাংলার সকল বাজেট পশ্চিম বাংলায় নিতে চাইতেন। এমনকি পূর্ব বাংলায় শিক্ষার বিস্তারিত চাইতেন না। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও বিপক্ষে ছিলেন।
অভিযোগ আছে, যেহেতু তিনি পশ্চিম বাংলায় জন্মগ্রহণ করেছেন। সেজন্য তিনি পশ্চিম বাংলা কে বেশি ভালোবাসতেন। তাছাড়াও সে সময় ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে ধনী এলাকা ছিলো পশ্চিম বাংলা। এজন্য তিনি সেখানেই সকল উন্নয়ন করা পক্ষে ছিলেন।

সে সময় ব্রিটিস সরকারের বেশির ভাগ বাজেটই পশ্চিমবঙ্গের জন্য ছিলো। এসবের প্রমাণ পাওয়া যায়, তৎকালীন সময়ের সব সরকারি স্থাপনা গুলো দেখে। যেমন ইডেন কার্ডেন ক্রিকেট স্টেডিয়াম যা তৎকালীন সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়াম ছিলো। কিন্তু পূর্ব বাংলায় এখনো পর্যন্ত মাত্র ২৫০০০ হাজার ধারণ ক্ষমতার স্টেডিয়াম রয়েছে।
এটা তো একটি উদাহরণ মাত্র, এমন হাজারো উদাহরণ পাওয়া যাবে। যেমন সমুদ্র বন্দর, রেলযোগাযোগ, কলকারখানা ইত্যাদি সকল উন্নয়ন সেখানে হতো। পশ্চিমবঙ্গেই কেন এসব উন্নয়ন হত তার মুল কারণ তো ভিন্ন। কিন্তু বাজটে আসার জন্য যে রাজনৈতিক ও কিছু বিখ্যাত ব্যক্তির ভুমিকা লাগে সেটা সম্পুর্ণ পেয়েছিলো পশ্চিমবঙ্গ। যার মধ্যে অন্যতম ছিলো এই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কিভাবে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত আমার সোনার বাংলা হলো
সমস্যা হলো এই জায়গায়, ‘আমার সোনার বাংলা ‘ লেখা হয়েছিলো অখণ্ড বাংলার জন্য। কিন্তু পরে কেন কিভাবে তা শুধু বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়ে যায়? এমনকি এই গানে একবারও বাংলাদেশ নামটিই উচ্চারিত হয়নি।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গানটির প্রথম ১০টি পঙ্ক্তি জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জারি করা ‘বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, পতাকা ও প্রতীক আদেশে’ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়; সংবিধানের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদেও প্রথম ১০টি পঙ্ক্তিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ বিরোধীতা করা পক্ষের মতে, যেহেতু ভারতে চলে হিন্দু সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ ছিলো মুসলিম সংস্কৃতি এজন্য পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ আলাদা করে তাদের ওপর হিন্দু সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়। যদিও এবিষয়ে বাংলাদেশের বেশিরভাগ জনগণের মত পার্থক্য রয়েছে।
রবি কি সত্যিই একজন কিংবদন্তী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, সাহিত্যিক ও সংগীতস্রষ্টা। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। যারফলে তিনিই প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী হয়ে রেকর্ড তৈরি করেন। তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের এবং ‘জনগণমন’ ভারতের জাতীয় সংগীত। সাহিত্য, সংগীত ও শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে সম্মানিত।
তিনি ভালোবাসা, বিরহ, প্রতিবাদ সহ অনেক বিষয়ে অনেক গান লিখেছিলেন যা এখনও মানুষের মুখে মুখে থাকে। এমনকি বর্তমানে তার নামে কেউ কটুক্তি করলেও তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। হ্যা এ-সব কারণে বলা যায়, তিনি একজন কিংবদন্তী ছিলেন।
শেষ কথা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ইতিহাসের নানা প্রশ্ন। তাঁর সাহিত্যিক অবদান যেমন অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও তথ্যভিত্তিক আলোচনা হতে পারে।
জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করা উচিত কি না, তা নির্ধারণে আবেগ নয়, বরং ইতিহাস, যুক্তি ও জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সত্য অনুসন্ধান ও নিরপেক্ষ আলোচনার মাধ্যমেই এই বিতর্কের যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব।




