সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ২০২৬ নিয়ে জামায়াতের ঢাকা মিছিল: কেন কুরআন-সুন্নাহবিরোধী বলছে দলটি?
ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে সম্প্রতি পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, আইনটির কিছু বিধান কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে এবং ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থা বা ফারায়েজের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিটের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে সমাবেশ শেষে রাজধানীতে এই বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। নেতারা আইনটি প্রত্যাহার এবং ইসলামী শরিয়ার আলোকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন – সম্পত্তির মালিক জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি হস্তান্তর করার পরও সেটি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার রাখলে, তার সঙ্গে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়েজের সম্পর্ক কোথায় দাঁড়াবে?
আইনটি নিয়ে বিতর্ক কেন?
আলোচিত ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর কিছু পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশোধিত বিধানের ফলে কোনো ব্যক্তি সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করার পরও জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও উপভোগের অধিকার রাখতে পারবেন।
সহারনপুর কালেক্টরেটের মসজিদ ভাঙচুর ঘিরে তীব্র বিতর্ক: আদালতের রায়, ৬.৪১ কোটি টাকার জরিমানা, ঐতিহাসিক দাবি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে কুয়া আবিষ্কারের পুরো ঘটনা
জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ইসলামপন্থী দল এই বিধান নিয়ে আপত্তি তুলেছে। তাদের আশঙ্কা, সম্পত্তি হস্তান্তরের এই সুযোগের অপব্যবহার হলে বৈধ উত্তরাধিকারীদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইসলামী উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়েজে একজন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয়। এ কারণে জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান, হস্তান্তর এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার এই বিষয়গুলোর মধ্যে আইনি ও ধর্মীয় পার্থক্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বায়তুল মোকাররম থেকে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল
আইনটির বিরোধিতা করে জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে সমাবেশ করে। সমাবেশ শেষে দলটির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিটের নেতাকর্মীরা রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
সমাবেশে দলটির নেতারা অভিযোগ করেন, সরকার এমন কিছু বিধান যুক্ত করেছে যা তাদের মতে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা আইনটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান।
জামায়াতের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনটি শুধু একটি সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনি পরিবর্তনের বিষয় নয়; এর সম্ভাব্য প্রভাব ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে। এ কারণেই দলটি বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
ফারায়েজের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কা কোথায়?
জামায়াত এবং আইনটির বিরোধিতাকারীদের মূল উদ্বেগ হলো জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি যদি এমনভাবে সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তন করেন, যাতে পরবর্তীতে বৈধ উত্তরাধিকারীরা তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে সেটি ইসলামী উত্তরাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলামী আইনে জীবদ্দশায় দান বা হিবা এবং মৃত্যুর পর সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন এক নয়। তাই নতুন আইনের নির্দিষ্ট ভাষা, এর প্রয়োগ এবং বিদ্যমান সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে এর সম্পর্ক বিশ্লেষণ ছাড়া কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে আইনটির পূর্ণ ধর্মীয় বা আইনি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে ইসলামি আইনবিদ, ফারায়েজ বিশেষজ্ঞ এবং সাংবিধানিক ও দেওয়ানি আইন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যান্য ইসলামপন্থী দলও প্রশ্ন তুলেছে
জামায়াতের পাশাপাশি কয়েকটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলও আইনটির কিছু বিধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন পক্ষ আইনটি ইসলামী শরিয়ার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে।
তাদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, দেশের প্রচলিত সম্পত্তি আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ইসরায়েলের পাল্টা হুমকি: ওয়েস্ট ব্যাংক বসতি নিয়ে ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা হলে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা
তবে আইনটির সমর্থক বা সরকারের পক্ষ থেকে এর উদ্দেশ্য, বাস্তব প্রয়োগ এবং বিরোধীদের উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা সামনে এলে বিতর্কটি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
বিতর্কের মূল প্রশ্ন এখন কী?
বর্তমান বিতর্কে দুটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমত, একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি কীভাবে এবং কোন শর্তে অন্যের কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, সেই হস্তান্তর ভবিষ্যতে বৈধ উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অধিকারের ওপর কোনো বাস্তব প্রভাব ফেলবে কি না।
মুসলিম সংবাদ ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন
এই দুটি প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে সংশোধিত আইনের নির্দিষ্ট ধারা, বিদ্যমান সম্পত্তি আইন এবং এর বিচারিক ব্যাখ্যার ওপর।জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, আইনটি প্রত্যাহার না হলে তারা আন্দোলন আরও জোরদার করবে। ফলে বিষয়টি আগামী দিনে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি ধর্মীয় ও আইনি আলোচনারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে চলমান এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক দাবি, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং আইনি বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা। আইনটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ, সরকারের ব্যাখ্যা এবং স্বাধীন আইন ও ইসলামি বিশেষজ্ঞদের মতামত সামনে এলে এর প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।




