দিল্লির ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে সংকট! বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, প্রবেশে বাধা, কাঁদলেন ইমাম – কী ঘটছে রেস কোর্স মসজিদে?

দিল্লির ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে সংকট!

দিল্লির ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে সংকট! বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, প্রবেশে বাধা, কাঁদলেন ইমাম – কী ঘটছে রেস কোর্স মসজিদে?

ভারতের ঐতিহাসিক রেস কোর্স মসজিদে নামাজ পড়ার অধিকার, বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ এবং তার অস্তিত্ব রক্ষার দাবি – সবকিছু ঘিরেই এখন প্রশ্ন উঠছে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে।

ভারতে ইদানীং মসজিদ ভাঙার উৎসব চলছে, সেই উৎসবের এই মসজিদটিও অংশ হয়ে যায় কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মসজিদটির ইমাম। 

জুমার নামাজের সময় ইমাম মোহাম্মদ হারুন অশ্রুসিক্ত দোয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে মসজিদটি  বাঁচানোর জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইছেন তিনি। 

তিনি দোয়ায় কি বললেন, কেন দোয়াটি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল? কেন ভারতে একের পর এক মসজিদ ভাঙা হচ্ছে? এবার কি এই মসজিদের পালা?  কেন এই মসজিদ নিয়ে তৈরি হয়েছে এত উদ্বেগ? কেন বিচ্ছিন্ন করা হলো বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ? আর দিল্লি হাইকোর্টের রায়েই বা কী বলা হয়েছে?

ইমামের কান্না, কেন আবেগাপ্লুত মুসল্লিরা?

দিল্লির ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে সংকট!
রেস কোর্স মসজিদে

২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর, শুক্রবার। দিল্লির রেস কোর্স মসজিদে জুমার নামাজের সময় ইমাম মোহাম্মদ হারুনের দোয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওতে তাঁকে দুই হাত তুলে আবেগঘনভাবে দোয়া করতে দেখা যায়। পাশে থাকা মুসল্লিরাও দোয়ায় অংশ নেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সঙ্গে প্রকাশিত বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম আল্লাহর কাছে মসজিদটির হিফাজত ও সাহায্য কামনা করেন। তাঁর দোয়ার সময় উপস্থিত মুসল্লিদের আবেগাপ্লুত হওয়ার দৃশ্যও আলোচনায় আসে।

প্রায় চার দশক ধরে এই মসজিদের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছেন ইমাম হারুন। ফলে মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা তাঁর ব্যক্তিগত উদ্বেগেরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি দোয়ায় বলেন,” হে মহান আল্লাহ তুমি তো সবকিছু সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা তুমি এই মসজিদ টি বাচিয়ে দেন। তুমি চাইলে তো সব সম্ভব। তুমি রক্ষা করো আমাদের ও তোমার ঘর এই রেস কোস মসজিদ। “

এছাড়াও তিনি তিনি অনেক দোয়া করেন৷ বিস্তারিত দেখতে চাইলে Muslim Sangbad YouTube channel ঘুরে দেখুন ।  9 pm

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি – ভিডিওতে প্রচারিত প্রতিটি বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই না করে সেগুলোকে হুবহু নিশ্চিত উদ্ধৃতি হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কী এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার কারণে এই ঐতিহাসিক মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে?

আসলে এই ঘটনার পেছনে রয়েছে জমির মালিকানা, ওয়াকফ সম্পত্তির স্বীকৃতি, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ এবং সরকারি উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে জটিল এক পরিস্থিতি।

দিল্লির ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে সংকট!
রেস কোর্স মসজিদে

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছের এই মসজিদটির ইতিহাস কী?

দিল্লির ৭, লোক কল্যাণ মার্গে অবস্থিত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের কাছেই রেস কোর্স মসজিদের অবস্থান। মসজিদটি রেস কোর্স ক্লাবের প্রায় ৫৩ একর বিস্তৃত এলাকার মধ্যে অবস্থিত। এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও সম্পত্তির আইনি অবস্থানের প্রশ্নও।

১৯৭৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বরের দিল্লি প্রশাসনের গেজেটে মসজিদ ও সংলগ্ন কবরস্থানকে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আর এটা তখন নিশ্চিত করেছিলো দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড।

এ ছাড়া ২০০৯ সালে মসজিদটি নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের বা NDMC-র গ্রেড-২ হেরিটেজ স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন।মসজিদটির ওয়াকফ ও হেরিটেজ পরিচয়ের ভেতরে রয়েছে। আবার অন্যদিকে সরকারি কর্তৃপক্ষ এলাকাটির জমির ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার এবং উচ্ছেদ কার্যক্রমের কথা বলছে। অর্থাৎ, বিতর্কটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে নয়।  এর সঙ্গে জমির অধিকার এবং সরকারি জমি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও জড়িত।

কেন বন্ধ হলো বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ?

গত ৭ অক্টোবর এলাকায় বস্তি উচ্ছেদ ও স্থাপনা অপসারণের কার্যক্রম চলার সময় এ কাজটি করে প্রশাসন। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এসময় মসজিদটির বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের দাবি, মসজিদটির সংযোগ দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে চালু ছিল এবং বকেয়া বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে সংযোগ পুনরুদ্ধারের আবেদনও জানায়

অন্যদিকে, NDMC আদালতে যুক্তি দেয় যে এলাকায় উচ্ছেদ ও ভাঙার কাজ চলছিল। এজন্য সংযোগ পুনরায় চালু করলে জননিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারতো। 

গাজা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর সমালোচনা, বয়কটের ডাক ও ব্যবসায়িক সংকটে লন্ডনের সিংস ডাইনিংয়ের মালিক হারমান সিং কাপুর

এদিকে ইমাম হারুন দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে মসজিদ প্রাঙ্গণ খালি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমে ছয় দিনের মধ্যে জায়গা ছাড়ার নির্দেশের কথাও প্রকাশিত হয়েছে।

তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারি বক্তব্যেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কিছু সরকারি সূত্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, মসজিদটির বিরুদ্ধে আলাদা করে কোনো উচ্ছেদ নোটিশ জারি করা হয়নি।

দিল্লির ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে সংকট!
রেস কোর্স মসজিদে

দিল্লি হাইকোর্টের রায়ে কী বলা হয়েছে?

মসজিদটির বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ পুনরুদ্ধারের দাবিতে ইমাম মোহাম্মদ হারুন দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। কিন্তু ১৫ অক্টোবর আদালত তাঁর আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, মসজিদ প্রাঙ্গণের ওপর ইমামের নিজস্ব স্বাধীন অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আদালত আরও উল্লেখ করে, দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডকে ওই সম্পত্তির মূল দখলদার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্তকে বোর্ড নিজে চ্যালেঞ্জ করেনি। এ কারণে এই আবেদনেই সব বিরোধের নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয় বলে আদালত সিদ্ধান্ত দেয়।

মসজিদটি রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?

মসজিদটি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পর দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড ১৯ ও ২১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ পুনরুদ্ধার এবং মসজিদটির সুরক্ষার দাবি জানানো হয়েছে। জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের প্রতিনিধিরাও কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সঙ্গে আলোচনা করছেন।

অন্যদিকে, এলাকায় উচ্ছেদ কার্যক্রম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা চলমান থাকায় মসজিদে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ২৩ অক্টোবর জুমার নামাজে মুসল্লিদের উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়। অর্থাৎ, মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ঘটনাটি এখনো আইনি অধিকার, সরকারি পদক্ষেপ এবং সংরক্ষণের দাবির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

দিল্লির রেস কোর্স মসজিদে ইমাম মোহাম্মদ হারুনের অশ্রুসিক্ত দোয়া অনেক মানুষের মনে আবেগ তৈরি করেছে। মসজিদটির ভবিষ্যৎ কী হবে, বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ ফিরবে কি না এবং সেখানে মুসল্লিদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে কিনা তা দেখার বিষয়। 

নাকি  মসজিদ উচ্ছেদের এই কার্যক্রম নিজ গতিতেই চলতে থাকবে। যারফল স্বরুপ এই মসজিদ টাও ভেঙে ফেলা হবে? একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে জরুরি হলো সত্যনিষ্ঠ তথ্য, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্যের যথাযথ মূল্যায়ন।

মুসলিম সংবাদ – মুসলিমের কথা বলে। 

Share on Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।