ভারতের আসামে উচ্ছেদ অভিযান: ঘরবাড়ি ভাঙায় তাবুতে হাজারো মুসলিম পরিবার, ভোটাধিকার নিয়েও শঙ্কা
ভারত: গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী যেভাবে সাধারণ মুসলিম জনগণের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে, তাদেরকে তাবুতে বসবাস করতে বাধ্য করছে। ঠিক একইভাবে ভারতের আসাম রাজ্যে মুসলমানদের ঘরবাড়ি অবৈধ ঘোষণা দিয়ে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
প্রায় আড়াই হাজারেও বেশি মুসলমানদের ঘরবাড়ি বাংলাদেশী মুসলিম তকমা দিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এটা ফিলিস্তিনের গাজা নয়, এটা ভারত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ যেখানে দেশে মুসলিম জনগণ কে তাদের নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে জোর করে তাবুতে বসবাস করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
তারা বাস্তুহারা হয়ে এখন খোলা মাঠে নীল-সাদা ত্রিপলের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। এমনকি তাদের স্কুল পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়েছে যারফলে শিশুরা পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, ভোটের আগে তাদের ভোটাধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
এই তথ্য প্রকাশ করেছেন, ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক রানা আইয়ুব। তিনি একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন, তাতে আসামের গোয়ালপাড়া এলাকার এই বাস্তুহারা মুসলিম পরিবারগুলোর করুণ চিত্র উঠে এসেছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, প্রবীণ মুসল্লিরা তাবুর পাশে বসে আছেন, তাদের হাতে পুরনো কাগজপত্র। ১৯৫১ সালের এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন্স), ১৯৬৬ সালের ভোটার লিস্ট, সরকারি দলিল। একজন বৃদ্ধ বলছেন, “আমরা সবকিছু দেখিয়েছি, কিন্তু তারপরও ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে।”
Nnn
আরেকজন যুবক সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমাদের সরকারি ঘর ছিল, স্কুল ছিল – সব ভেঙে ফেলা হয়েছে।” রানা আইয়ুবের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে: “আসাম যখন ভোটের দিকে এগোচ্ছে, তখন এই পরিবারগুলোর সঙ্গে আমি কথা বলেছি।
তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, আর রাজ্য সরকার বলছে – উচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিরা ভোট দিতে পারবে না। যদিও প্রত্যেকের কাছে নাগরিকত্ব প্রমাণের সব দলিল আছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রে তারা এখন রাষ্ট্রহীন।
”ভিডিওতে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, এই এলাকায় মোট ৬৮১টি পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে। সদস্য সংখ্যা ধরলে তা ২ থেকে ২.৫ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। একজন বলেন, “আমাদের ঘরও গেছে, স্কুলও ভেঙে ফেলা হয়েছে। দুটি স্কুল ছিল এই এলাকায় – সে দুটো স্কুলই ধ্বংস করা হয়েছে।”
বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এরপর আগুন: চাকরির কথা বলে ডেকে এনে নারীকে দগ্ধের অভিযোগ
এক শিশুর দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়, “এই বাচ্চাটি স্কুল ছেড়ে দিয়েছে।” আরেকজন যুবক উত্তেজিত হয়ে বলেন, “আমাদের জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছি।” এই উচ্ছেদ অভিযান চলছে আসামের বিজেপি সরকারের নির্দেশে।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি জমি ও জলাভূমি থেকে ‘অবৈধ’ বসতি সরানোর নামে মূলত বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারগুলোকে টার্গেট করা হচ্ছে। অথচ এই পরিবারগুলো দশকের পর দশক ধরে ভারতে বসবাস করছে।
তারা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়ে আসছে, তাদের কাছে সরকারি দলিল রয়েছে। কিন্তু তারপরও এপ্রিল ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে, তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে। ফর্ম-৬ জমা দিলেও কোনো লাভ হয়নি। ফলে তারা এখন আশ্রয়হীন এবং ভোটাধিকারহীন -দুদিক থেকেই বঞ্চিত।
নিশাত তাসনীমের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক: ইসলামে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ কি জায়েজ
একজন বৃদ্ধা মহিলা ভিডিওতে কান্নাভরা গলায় বলেন, “আমাদের ঘর নেই, কোথায় যাব?” বাচ্চারা খোলা মাঠে খেলছে, কিন্তু তাদের চোখে ভয় আর অনিশ্চয়তা। গরমে এক শিশু ইতিমধ্যে মারা গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এই দৃশ্যগুলো দেখে মনে হয়, গাজার তাবু শিবিরের প্রতিচ্ছবি। সেখানে ইসরায়েলি ঘরবাড়ি ধ্বংস করে মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। আর ভারতে একই কাজ করছে ভারতীয় প্রশাসন বুলডোজার দিয়ে।
বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্প্রদায় এই ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে। ভারতের মুসলিমরা যে ক্রমাগত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন- সেটা এখন আর গোপন নয়। আসামে এই উচ্ছেদ অভিযানকে অনেকে ‘মুসলিম-বিরোধী’ রাজনৈতিক খেলা বলে অভিহিত করছেন।
বিসিবিতে অস্থিরতা ও ‘বাইরের শক্তি’ বিতর্ক: বুলবুলের অভিযোগ, ভারত ও বিএনপি চাই তামিম
বিজেপি সরকারের দাবি, এটা অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান। কিন্তু যাদের কাছে ১৯৫১ সালের এনআরসি, ভোটার লিস্ট, সরকারি দলিল আছে, তাদেরকে কেন ‘অবৈধ’ বলা হচ্ছে? কেন তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে নির্বাচনের ঠিক আগে?
রানা আইয়ুবের এই প্রতিবেদন বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার মুসলিম যুবক-যুবতী এই ভিডিও শেয়ার করে লিখছেন- এটা গাজা নয়, এটা আসাম কিন্তু নির্যাতন একই।
Watch Muslim Sangbad Video On You Tube
বাংলাদেশের মানুষেরা এই ঘটনায় বিশেষভাবে মর্মাহত, কারণ আসামের এই পরিবারগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি বাংলাদেশের সঙ্গে মিলে যায়। অনেকে প্রশ্ন তুলছে- ভারত কি মুসলিমদের নাগরিকত্বই কেড়ে নিতে চায়?
এই ‘দ্বিতীয় গাজা’ যদি চলতে থাকে, তাহলে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ কোথায়? ঘর নেই, ভোট নেই, শিক্ষা নেই – শুধু তাবুর নিচে অনিশ্চিত জীবন। আন্তর্জাতিক মুসলিম সংগঠনগুলোর উচিত এই বিষয়ে সোচ্চার হওয়া। কারণ আজ আসাম, কাল হয়তো অন্য কোনো রাজ্য।



