ওবামার চাপেও থামেনি বসতি স্থাপন , পশ্চিম তীরে জনসংখ্যা দ্বিগুণের দাবি নেতানিয়াহুর
ওবামা যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন – ইজরায়েলের কাজে বাঁধা দেওয়া হত। আমাদের ফিলিস্তিনের গ্রীন লাইন পার না হতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু আমরা তা শুনিনি। তখন ওই চাপের সময়ও ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে, আমাদের জনসংখ্যা দ্বিগুণ করেছিলাম।
সম্প্রতি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তার নির্বাচনী প্রচারণায় এমন দাবি করেন। তিনি এটা নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি এ মন্তব্য করা পর বলেন, ইজরায়েল কি করবে, কি করবে না – তা আমরা ঠিক করবো।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ওবামা কেন এই বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছিলেন? নেতানিয়াহুর দাবি কী বার্তা দিচ্ছে? আর এর ফলে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা কতটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?
ওবামাকে জবাব দিয়ে কী বললেন নেতানিয়াহু?
নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে গ্রিন লাইনের বাইরে নতুন নির্মাণকাজ না করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়েও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে নেতানিয়াহু মূলত বোঝাতে চেয়েছেন, আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও তাঁর সরকার বসতি সম্প্রসারণের নীতি এগিয়ে নিতে পেরেছে। এজন্য আমাদের সরকার কে আবারও নির্বাচিত করুন। তার বক্তব্যে তিনি এমনই মনোভাব প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।
তবে তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করা গ্রিন লাইন পার করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির নির্দিষ্ট হিসাব এবং উদ্ধৃতির পূর্ণ প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হতে পারে তিনি নিজের সাফল্য দেখানোর জন্য এভাবে বাড়িয়ে বলছেন৷
গ্রিন লাইন আসলে কী?
গ্রিন লাইন হলো ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত সীমারেখা, যা ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের আগের অবস্থান চিহ্নিত করে। ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমসহ বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে। ইসরায়েল পশ্চিম তীরকে ঐতিহাসিকভাবে জুডিয়া ও সামারিয়া বলে উল্লেখ করে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিরা এই অঞ্চলকে তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে। ফলে এখানে বসতি নির্মাণের প্রশ্নটি শুধু বাড়িঘর তৈরির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব এবং ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের প্রশ্ন।
ওবামা কেন বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছিলেন?
বারাক ওবামার প্রশাসন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছিল। কারণ, এই বসতিগুলো ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বলতে বোঝায় – ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে পাশাপাশি অস্তিত্ব। কিন্তু পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো বিস্তৃত হলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলাদেশের মানুষ এত ভালোবাসে কেন? জাতীয় সংগীত, ইতিহাস ও বিতর্কের নেপথ্যে
ওবামা প্রশাসনের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বসতি নির্মাণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখানেই উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন – যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রের চাপও কেন ইসরায়েলের নীতি পরিবর্তনে যথেষ্ট হয়নি? তিনি কি আমেরিকার আপত্তি হোক বা না হোক এসব কিছুর তোয়াক্কা করেন না।

বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের অবস্থান কী?
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে বিরোধিতার মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতির কোনো আইনি বৈধতা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের উপস্থিতি ও নীতির আইনি পরিণতি নিয়ে পরামর্শমূলক মতামত দেয়। আদালত বসতি স্থাপনসহ বিভিন্ন নীতির বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
তবে নেতানিয়াহু সরকার ঐতিহাসিক অধিকার ও নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক মতবিরোধ নয়; আন্তর্জাতিক আইন ও ভূখণ্ডের অধিকার নিয়েও গভীর বিরোধ রয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কোথায়?
পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার ওপর। কারণ, বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের মধ্যে একটি কার্যকর ও সংযুক্ত রাষ্ট্র গঠন করা কঠিন। বসতি, সড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামোর বিস্তার সেই জটিলতা আরও বাড়াতে পারে।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে তাঁর সমর্থকেরা দৃঢ় অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু সমালোচকদের কাছে এটি ভালো নীতির প্রতিফলন নয়। এই নীতি ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডগত অধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কি কখনো বসতি থামাতে পেরেছে?
ওবামা ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ক দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্রতা থাকলেও সব বিষয়ে তাদের অবস্থান এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ বসতি নীতি নিয়ে বিরোধ তৈরি করেছিল, কিন্তু সেই চাপ বসতি সম্প্রসারণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারেনি।
আর নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের মূল রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই – তিনি অতীতের চাপের মুখে নিজের অবস্থান পরিবর্তন না করাকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু তিনি যে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অবজ্ঞা করে এসব করেছেন তারপরও কেন আমেরিকা ইসরায়েল কে সমর্থন করেন।
তবে এই বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে ইসরায়েলের নীতি, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর। ইতিমধ্যে আমেরিকার রাজনীতিতে এই বক্তব্যের প্রতিফলন একদমই পড়েনি। অবস্থা এমন যে যুক্তরাষ্ট্র ভাবছে এটা তো স্বাভাবিক।
পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের প্রশ্নটি আসলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে। একটি ভূখণ্ডে কার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। সবার সামনে নেতানিয়াহুর এমন বক্তব্যের পরেও কেন বিশ্ববাসী চুপ থাকে।
একই ঘটনা যদি ফিলিস্তিন করতো বা তাদের স্বাধীনতাকামী সংগঠন করতো – তাহলে এতক্ষণ বিশ্ব তোলপাড় করে ফেলতো। পশ্চিমা মিডিয়া সবার আগে হেডলাইন দিতো। কেন নেতানিয়াহুর সময় সবাই নিরব এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।




