মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: ইসলামের আইন কী বলে, আর প্রবাসীদের অধিকার কোথায়?

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: ইসলামের আইন কী বলে, আর প্রবাসীদের অধিকার কোথায়?

সৌদিআরব: মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে তাঁদের এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু ঘটনা ঠিক ঘটেছিল? তারা কি স্বামী স্ত্রী ছিলেন? এই ঘটনার বিচার কাজ কবে থেকে শুরু হয়েছিল? ইসলামের আইনে এমন অপরাধের বিচার কীভাবে হওয়ার কথা? আর বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি অন্যায়ের শিকার হলে তাঁর অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কার? সাথে বাংলাদেশের সরকার কে কেন জানাইনি সৌদি কর্তৃপক্ষ? 

মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা – কী বলছে সৌদি কর্তৃপক্ষ?

সৌদি প্রেস এজেন্সিতে প্রকাশিত দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁরা হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আখতার, যিনি সুইটি আখতার নামেও পরিচিত।

সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে ২০২৩ সালে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে তাজির হিসেবে ২০২৬ সালে এসে তাদের মৃত্যুদণ্ড আদেশ হয়। পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া ও রাজকীয় আদেশের পর শাস্তি কার্যকর করা হয়।

তবে ঠিক কী ঘটেছিল, কী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত কী? এসব বিষয়ে প্রকাশিত বিবৃতিতে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। কারণ সৌদি আরবে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা খুবই কম। এমনকি সেখানে গণমাধ্যম পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করতে বাঁধা পায়। 

সৌদি আরবে কোনো বেসরকারি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নেই, সবগুলো সরকার দ্বারা পরিচালিত। সাথে দেশটি গণমাধ্যমে স্বাধীনতায় ১৮০ টি দেশটির মধ্যে ১৭৬ তম। অর্থাৎ এখানে তথ্য সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারা যা বলবে তাই সবকিছু। এজন্য বাংলাদেশ সরকারও সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে।

Watch Muslim sangbad Video

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড
photos from google

এখানে মনে রাখতে হবে, সরকারি বিবৃতিতে অভিযোগ ও রায়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নথি ছাড়া মামলার প্রতিটি দিক স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। 

ভাইরাল ভিডিও, সম্পর্ক ও মরদেহ – কোনটি সত্য?

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়ে। কেউ তাঁদের স্বামী-স্ত্রী বলেছেন, কেউ নববিবাহিত দম্পতি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আবার কিছু ভিডিও ও কফিনের দৃশ্য তাঁদের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে। এমনকি তাদের ছোট বাচ্চা মাবাবার পাশে কাঁদছে সে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। 

কিন্তু কোনো ভিডিও ভাইরাল হলেই সেটি সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রমাণ হয়ে যায় না। তাঁদের সম্পর্ক কিংবা কথিত ঘটনার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। পরিবারের বক্তব্যও এসব দাবি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড
photos from google

একইভাবে, কোনো কফিনের ভিডিও দেখেই সেটিকে নজরুল বা সুইটির মরদেহ বলে শনাক্ত করা যায় না। মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য প্রয়োজন।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। তাই তাঁদের শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। এ বিষয়ে নিশ্চিত দাবি করা ঠিক হবে না।

এদিকে ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, তারা স্বামী স্ত্রী ছিলোনা। অন্তত্য পক্ষে তার পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এটাই প্রমাণ হয়। কিন্তু তারা গোপনে বিবাহ করেছিলো কিনা তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। 

ইসলামের আইন কী বলে – অভিযোগ, প্রমাণ ও শাস্তি

এবার আসা যাক ইসলামের আইনের প্রশ্নে।

ইসলামী আইনে সব অপরাধের শাস্তি এক নয়। অপরাধের ধরন, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনি বিধান অনুযায়ী বিচার করা হয়।সূরা আন-নূরের চতুর্থ আয়াতে ব্যভিচারের অভিযোগ এনে চারজন সাক্ষী হাজির করার বিষয়ে কঠোর বিধান রয়েছে। ধ্রুপদি ইসলামী ফিকহে জিনার হদ্দ প্রতিষ্ঠার জন্যও অত্যন্ত কঠোর প্রমাণের শর্ত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন: কোনো কাজকে অনৈতিক বলা, ব্যভিচারের অভিযোগ আনা এবং আদালতে নির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হওয়াস- এক বিষয় নয়।

গাজা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর সমালোচনা, বয়কটের ডাক ও ব্যবসায়িক সংকটে লন্ডনের সিংস ডাইনিংয়ের মালিক হারমান সিং কাপুর

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড তাজির হিসেবে কার্যকর করা হয়েছে। ইসলামী ফৌজদারি আইনশাস্ত্রে তাজির বলতে নির্দিষ্ট হদ্দের আওতায় না থাকা অপরাধের জন্য কর্তৃপক্ষ বা বিচারকের বিবেচনায় নির্ধারিত শাস্তিকে বোঝানো হয়।

কিন্তু শুধু তাজির শব্দটি উল্লেখ করলেই নির্দিষ্ট মৃত্যুদণ্ডের সব আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট হয়ে যায় না। কোন অপরাধে, কী প্রমাণের ভিত্তিতে এবং কোন আইনি যুক্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে – তা জানতে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রয়োজন।

এ কারণেই এই মামলার বিচারিক নথি প্রকাশ ও স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের গুরুত্ব রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া একদিকে যেমন বিচারপ্রক্রিয়াকে নিশ্চিতভাবে অন্যায় বলা যায় না, অন্যদিকে সব আইনি শর্ত পূরণ হয়েছে বলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

সৌদি আরবে প্রবাসীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার – কী বলছে মানবাধিকার প্রতিবেদন?

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড
photos from google

নজরুল ও সুইটির মামলার বাইরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে – সৌদি আরবে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সৌদি আরবে অভিবাসী শ্রমিকদের শোষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে। এসব প্রতিবেদনে কিছু নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে বেতন আটকে রাখা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, চলাচলে বাধা এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছে।

কিছু শ্রমিকের ক্ষেত্রে নিয়োগের নামে অতিরিক্ত ফি আদায়, চুক্তি অনুযায়ী বেতন না দেওয়া এবং অভিযোগ করলে চাকরি হারানো বা দেশে ফেরত পাঠানোর ভয় দেখানোর কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এমনকি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নারী কর্মীদের অনেকের দাবি তাদের সাথে তাদের সৌদি মালিকেরা খারাপ ব্যবহার করেন। তাদের সাথে শারিরীক ও মানসিক এমন যৌন নির্যাতনের অভিযোগও তুলেছেন। তাদের অভিযোগ এক্ষেত্রে তাদের বিচার হয়না। কিন্তু অন্য দেশের নাগরিকদের সাথে ইসলামের আইন কার্যকর করা হয়। 

এখানে স্পষ্ট থাকা জরুরি – এসব অভিযোগ সব সৌদি নাগরিক বা সব নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে নয়। আর এই শ্রমিক-শোষণের প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গে নজরুল ও সুইটির মামলার সরাসরি সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে এসব তথ্য দেখায়, বিদেশে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

একজন শ্রমিক নিজের পরিবারকে ভালো রাখার জন্য বিদেশে যান। তিনি যদি সেখানে বেতন, নিরাপত্তা কিংবা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে তাঁর অভিযোগ শোনার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

 ইসলামে শ্রমিকের অধিকার ও নিয়োগকর্তার দায়িত্ব

ইসলামে ন্যায়বিচার শুধু অপরাধের শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সূরা আন-নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে ন্যায়বিচারে দৃঢ় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, ইসলামী শিক্ষায় শ্রমিকের পারিশ্রমিক যথাযথভাবে দেওয়া এবং মানুষের প্রতি জুলুম না করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

সুতরাং কোনো শ্রমিকের বেতন আটকে রাখা, তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো কিংবা তাঁর অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই, প্রমাণ মূল্যায়ন এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ, কেউ প্রবাসী বলে তাঁর অধিকার কমে যায় না। আবার কেউ অভিযোগের মুখোমুখি হলেই তাঁকে প্রমাণ ছাড়াই নির্দোষ বা দোষী ঘোষণা করাও ন্যায়সংগত নয়। ন্যায়বিচারের মূলনীতি হলো – ক্ষমতাবান ও দুর্বল, স্থানীয় ও বিদেশি, সবার ক্ষেত্রেই প্রমাণ এবং আইনকে গুরুত্ব দেওয়া।

বাংলাদেশের করণীয় – প্রবাসীদের সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে?

নজরুল ও সুইটি আখতারের ঘটনা থেকে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামনে আসে।

প্রথমত, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ রায়, অভিযোগের বিবরণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নথি সংগ্রহ করতে হবে। তাঁরা আইনজীবী পেয়েছিলেন কি না, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না এবং আপিলের প্রক্রিয়া কী ছিল – এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

তৃতীয়ত, বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার সেবা আরও কার্যকর করতে হবে। নির্যাতন, বেতন না পাওয়া কিংবা নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধের ক্ষেত্রে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, সে বিষয়ে শ্রমিকদের আগেই স্পষ্ট ধারণা দেওয়া জরুরি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলাদেশের মানুষ এত ভালোবাসে কেন? জাতীয় সংগীত, ইতিহাস ও বিতর্কের নেপথ্যে

চতুর্থত, বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগকর্তার পরিচয়, কাজের ধরন, বেতন এবং চুক্তির শর্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ নিয়োগ ফি ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই সম্পর্কের পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার রক্ষাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

নজরুল ও সুইটি আখতারের ঘটনা আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে – একটি মৃত্যুদণ্ডের পেছনে ঠিক কী ঘটেছিল, বিচারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল এবং বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের অধিকার কীভাবে আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত করা যায়।

আমাদের উচিত নয় প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা করা। একইভাবে, কোনো ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও উপেক্ষা করা যায় না।

ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষা হোক কিংবা আধুনিক আইনের মূলনীতি – অভিযোগ যাচাই, প্রমাণের গুরুত্ব এবং মানুষের অধিকার রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Muslim Sangbad –  মুসলিমের কথা বলে।

Share on Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।