ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ কী? গাদি আইজেনকোটের চ্যালেঞ্জ ও ইরান সংঘাতের প্রভাব
ইসরায়েলের রাজনীতিতে কি শেষ হতে চলেছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসন? নাকি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের হুমকি, নিরাপত্তার প্রশ্ন আর রাজনৈতিক সমীকরণ কাজে লাগিয়ে আবারও ক্ষমতায় ফিরবেন তিনি? অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান মুখ গাদি আইজেনকোট কি হতে যাচ্ছেন ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী?
কিন্তু সরকার বদলালেই কি গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জীবনে পরিবর্তন আসবে? আর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সঙ্গে সংঘাতের হিসাব কীভাবে বদলে দিতে পারে এই নির্বাচন? আজকের বিশ্লেষণে থাকছে ইসরায়েলের ক্ষমতার লড়াইয়ের ভেতরের হিসাব।
ভোটের মাঠে কে এগিয়ে?
ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশটির পার্লামেন্ট কনেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন। কিন্তু নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো – এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে কে?
অক্টোবরের মাঝামাঝি প্রকাশিত জরিপগুলোর গড় হিসাবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি প্রায় ২২টি আসন পাচ্ছে। অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টিও প্রায় ২১ থেকে ২২টি আসনের লড়াইয়ে রয়েছে।

অর্থাৎ, একক দল হিসেবে দুজনের কেউই খুব বেশি ব্যবধানে এগিয়ে নেই। আর সরকার গঠনের হিসাব আরও জটিল। সাম্প্রতিক একটি চ্যানেল ১২ জরিপে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবিরের জন্য ৪৯টি আসন এবং প্রধান বিরোধী দলগুলোর জন্য ৫৪টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্ভাব্য ১৩টি আসনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিরোধী দলগুলো আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনে একমত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে বেশি আসন পেলেই যে সরকার গঠন নিশ্চিত, এমন নয়। এখানেই নির্বাচনের প্রথম বড় অনিশ্চয়তা – কোনো শিবিরের পক্ষে ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না।
নেতানিয়াহুর প্রধান চ্যালেঞ্জার কে?
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিরোধীদের অন্যতম প্রধান মুখ গাদি আইজেনকোট। তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান এবং বর্তমানে ইয়াশার পার্টির নেতা। তাঁর জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে নিরাপত্তা ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার আগে গোয়েন্দা ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে অসন্তুষ্ট ভোটারদের একটি অংশও তাঁর দিকে ঝুঁকছে।
তবে আইজেনকোটকে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রশ্নে উদারপন্থী নেতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে স্পষ্ট সমর্থন দেননি, বসতি সম্প্রসারণের সাধারণ নীতিকেও সমর্থন করেন এবং হামাসকে নিরস্ত্র করার শর্তে গাজা নিয়ে মার্কিন-সমর্থিত পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে, নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন টুগেদার জোটও বিরোধী শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। পাশাপাশি রয়েছেন ইয়াইর গোলান ও আভিগদর লিবারম্যানের মতো নেতারা।

কিন্তু নেতানিয়াহুকে সরানোর বিষয়ে একমত হলেও প্রতিরক্ষা, ফিলিস্তিন নীতি এবং সরকার পরিচালনার প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্যই শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের সরকার গঠনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ক্ষমতার অঙ্কে হারেদি ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন
নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো হারেদি বা অতি-ধর্মীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের সামরিক সেবা। দীর্ঘদিন ধরে এই সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি বা বিশেষ ছাড় পেয়ে আসছে। কিন্তু অন্য ইসরায়েলিদের সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে।
আইজেনকোট বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ক্ষেত্রে এই ছাড়ের অবসান চান। বেনেটও বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এনেছেন। অন্যদিকে, হারেদি দলগুলো সরকার গঠনের আলোচনায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চাইবে। তবে এই নির্বাচন শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়। ফিলিস্তিনিদের জন্যও এর গুরুত্ব রয়েছে।
নেতানিয়াহুর বিদায় ঘটলে গাজা যুদ্ধের নীতি, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু বিরোধী নেতাদের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কিংবা দখলদারত্বের অবসান নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, নেতানিয়াহুর বিরোধীরা ক্ষমতায় এলেও ফিলিস্তিন বিষয়ে ইসরায়েলের মৌলিক নীতি খুব বেশি বদলানোর সম্ভাবনা সীমিত। অর্থাৎ, ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তন আর ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা – দুটি এক বিষয় নয়।
ট্রাম্প ও ইরানের যুদ্ধ কি বদলে দেবে ফলাফল?
এবার আসা যাক নির্বাচনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাইরের সমীকরণে – আমেরিকা ও ইরান। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের পর নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
অ্যাক্সিওসের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে একাধিক মার্কিন ও ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস নতুন করে হামলার বিষয়ে তাঁদের আলোচনার খবর অস্বীকার করেছে।
এখানে ট্রাম্পের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন করে হামলা চালাবে না। কিন্তু এই ঘোষণা ভবিষ্যতে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ করে না। ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার রাজনৈতিক প্রভাব দুই দিকেই যেতে পারে।
একদিকে, নেতানিয়াহু নিজেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, প্রাণহানি ও নিরাপত্তা সংকট তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়াতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও আলোচনায় এসেছে, যদিও নির্বাচন স্থগিত হবে – এমন কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই।
তবে মনে রাখতে হবে, যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আর হামলা চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এক নয়। কূটনৈতিক আলোচনা, সামরিক পরিস্থিতি এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি – সবকিছুই শেষ মুহূর্তে সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলাদেশের মানুষ এত ভালোবাসে কেন? জাতীয় সংগীত, ইতিহাস ও বিতর্কের নেপথ্যে
কে হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী?
সব মিলিয়ে, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসরায়েলে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা, আইজেনকোটের নেতৃত্বে বিরোধীদের ঐক্য এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ভবিষ্যৎ।
নেতানিয়াহু আবারও সরকার গঠন করতে পারেন। বিরোধীরাও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সুযোগ রাখছে। আবার কোনো পক্ষই ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘ কোয়ালিশন আলোচনা কিংবা রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে – নেতৃত্ব বদলালে কি ইসরায়েলের নীতি বদলাবে? বিশেষ করে গাজা, পশ্চিম তীর এবং ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে?
নির্বাচনের ফলাফল সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেবে না। উত্তর নির্ভর করবে নতুন সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার নীতি বাস্তবে কতটা বদলায় এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আসে, তার ওপর। আপনি কী মনে করেন – নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় ফিরবেন, নাকি ইসরায়েলে নতুন নেতৃত্ব আসবে? মন্তব্যে আপনার মতামত জানান।




