ইরানে ৭.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার: কতটা বদলাতে পারে দেশটির জ্বালানি পরিস্থিতি?

ইরানে ৭.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার

ইরানে ৭.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার: কতটা বদলাতে পারে দেশটির জ্বালানি পরিস্থিতি?

ইরান: ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশে ৭.৫ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিটেরও বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। ইরানের তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ ২৩ আগস্ট এ তথ্য জানান।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আবিষ্কৃত গ্যাসের মধ্যে প্রায় ৫.৭ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট উত্তোলনযোগ্য বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সংখ্যাটি বড় মনে হলেও প্রশ্ন হলো – এই গ্যাস আবিষ্কার ইরানের জন্য বাস্তবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আর এত বড় মজুদ থাকা সত্ত্বেও দেশটির জ্বালানি সংকটের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

নতুন গ্যাসক্ষেত্রে আসলে কী পাওয়া গেছে?

ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন ক্ষেত্রটিতে মোট গ্যাসের পরিমাণ ৭.৫ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিটের বেশি। এর একটি অংশ প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্যাসটির প্রকৃতি। ইরানের তেলমন্ত্রী এটিকে ‘সুইট গ্যাস’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সাধারণভাবে সুইট গ্যাসে হাইড্রোজেন সালফাইডের পরিমাণ কম থাকে। ফলে গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর কি ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হয়ে থাকে।

ইসলাম গ্রহণের গুঞ্জন নাকচ করলেন রবার্তো কার্লোস: ইসলামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আছে, তবে ধর্মান্তরিত হইনি

এ ক্ষেত্রটিতে গ্যাসের পাশাপাশি গ্যাস কনডেনসেটও রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে উৎপাদন শুরু হলে গ্যাসের পাশাপাশি তরল হাইড্রোকার্বন থেকেও অর্থনৈতিক মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইরানে ৭.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার

৭.৫ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট – এটা কত বড়?

তুলনাটি বুঝতে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস সম্পদ সাউথ পার্স কে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সাউথ পার্স ইরান ও কাতারের মধ্যে ভাগ করা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র এবং ইরানের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অংশ।

ইরানি কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, নতুন আবিষ্কারের উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ সাউথ পার্সের একটি ফেজের প্রায় ১৫ বছরের উৎপাদনের সমপরিমাণ হতে পারে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি – মাটির নিচে থাকা গ্যাসের পরিমাণ এবং বাস্তবে উৎপাদনযোগ্য গ্যাস এক জিনিস নয়। ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়ন, কূপ খনন, চাপ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে শেষ পর্যন্ত কতটা গ্যাস উত্তোলন করা যাবে, তার ওপর নির্ভর করবে গ্যাস ক্ষেত্রটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। 

তাহলে ইরানের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইরান বিশ্বের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদধারী দেশ। কিন্তু বিপুল মজুদ থাকা মানেই সবসময় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হওয়া নয়। দেশটির অভ্যন্তরীণ গ্যাসের চাহিদা অনেক বেশি। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, আবাসিক ব্যবহার এবং অন্যান্য খাতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন হয়। ফলে নতুন একটি বড় গ্যাসক্ষেত্র ভবিষ্যতে ইরানের জন্য তিনটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

প্রথমত, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়ানো : উৎপাদন শুরু হলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, পুরোনো ক্ষেত্রের ওপর চাপ কমানো:  ইরানের গ্যাস ব্যবস্থার বড় অংশ কয়েকটি বড় ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল। নতুন উৎস তৈরি হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা বৈচিত্র্য আসতে পারে।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করা:  গ্যাস কনডেনসেটসহ উৎপাদন শুরু হলে দেশটি অতিরিক্ত জ্বালানি সম্পদ থেকে আয় করার সুযোগ পেতে পারে।

গাজার পক্ষে জাপানের টোকিওর রাস্তায় হাজার দিনের বেশি প্রতিবাদ করছেন- ইউসুকে ফুরুসাওয়া

কিন্তু আবিষ্কার মানেই আগামীকাল থেকে গ্যাস পাওয়া নয়

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর সেটিকে উৎপাদনে আনতে সাধারণত আরও অনেক ধাপ প্রয়োজন। ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়ন, কূপ খনন, উৎপাদন পরিকল্পনা, গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা, পাইপলাইন এবং অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করতে সময় ও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

অর্থাৎ আজ ৭.৫ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস আবিষ্কারের ঘোষণা এলেও এর পুরো সুফল ইরান তাৎক্ষণিকভাবে পাবে না। বরং বড় প্রশ্ন হবে – ইরান কত দ্রুত এবং কত কম খরচে এই গ্যাসকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আনতে পারে।

ইরানের বর্তমান জ্বালানি বাস্তবতা

নতুন আবিষ্কারের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় ইরানের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে। দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত ও অবকাঠামোগত ক্ষতির বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। ফলে নতুন সম্পদ আবিষ্কার করলেও সেটিকে দ্রুত উৎপাদনে আনা সহজ হবে না।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য বিদেশি প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সুযোগ সীমিত করতে পারে। বড় গ্যাস প্রকল্পে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই হয় না – প্রয়োজন বিপুল মূলধন, প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত পরিকল্পনা।

তাহলে কি ইরানের গ্যাস সংকট শেষ হয়ে যাবে?

না, অন্তত এখনই এমনটা বলা যায় না। নতুন ক্ষেত্রটি ভবিষ্যতে ইরানের গ্যাস সরবরাহকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু এটি তাৎক্ষণিক সংকটের সমাধান নয়। কারণ আবিষ্কার থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে সময় লাগবে। একই সঙ্গে উৎপাদনের পরিমাণ, কূপের কার্যক্ষমতা এবং অবকাঠামো কত দ্রুত তৈরি করা যায় – এসব বিষয়ও ফলাফল নির্ধারণ করবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিসংখ্যানগুলো মূলত ইরান সরকারের ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে। স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের পূর্ণাঙ্গ ভূতাত্ত্বিক যাচাই বা রিজার্ভ সার্টিফিকেশনের তথ্য প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত সংখ্যাগুলোকে প্রাথমিক হিসাব হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

মুসলিম সংবাদ চ্যানেলের ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন 

ফার্স প্রদেশে ৭.৫ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিটের বেশি গ্যাসের আবিষ্কার ইরানের জন্য নিঃসন্দেহে বড় খবর। বিশেষ করে যখন দেশটি জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো এবং বিনিয়োগের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন নতুন বড় গ্যাস সম্পদ ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

তবে এর আসল মূল্য নির্ধারিত হবে আবিষ্কারের আকার দিয়ে নয়, উৎপাদনে আনার সক্ষমতা দিয়ে। ইরান যদি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে নতুন ক্ষেত্রটি আগামী বছরগুলোতে দেশের শিল্প ও জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে। আর সেটি সম্ভব না হলে বিশাল মাটির নিচের মজুদ কাগজে বড় সংখ্যা হয়েই থেকে যেতে পারে।

মুসলিম সংবাদ – মুসলিম উম্মাহর কন্ঠস্বর। 


সোর্স : ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। 

Share on Social Media

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।