
নাস্তিককে সাথে হুজুরের যুক্তির প্রতিযোগিতা : তারপর কি ঘটলো
বছরের পর বছর ধরে, ভারতের টিভি চ্যানেলগুলি ৫০০০ টাকার সস্তা মুসলিম ধর্মগুরুদের উপহাস করার জন্য প্রদর্শন করে এসেছে এতে দর্শকরা হেসেছে। কিন্তু এবার ভারতে এসেছে, একজন বিদ্বান মুসলিম মুফতি। যিনি মূলধারার গণমাধ্যমের ধারণাগুলিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে The Lallantop নামে ভারতের বড় একটি গণমাধ্যমে তর্কপ্রতিযোগিতা করেন।
The Lallantop এর ইউটিউবে ৩৪.৬ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইব আছে। যেখানে মুফতি সামাইল ইহুদি যাভেদ আক্তারের সাথে ডিবেট করেন। ডিবেটের শিরোনাম Does God Exist. যেখানে অসাধারণ ভঙ্গিমায়, যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে নাস্তিকের সাথে ডিবেট বা তর্ক প্রতিযোগিতা করেন। যেখানে তিনি কোরআন হাদিসের একটি কথা না বলেও শুধু লজিক দিয়ে বক্তব্য পেশ করেছেন।
তার এই ডিবেট বর্তমানে সোসিয়াল মিডিয়ায় চরম আকারে ভাইরাল হয়েছে। শুধু The Lallantop এ এখনো পর্যন্ত প্রায় ৫০ লাখের কাছাকাছি মানুষ ভিডিও টি দেখেছেন। টিকটিক সহ সোসিয়াল মিডিয়ার রিলস সেকশনে মুফতি সামাইলের ভিডিও ট্রেন্ডিং এ রয়েছে।
তার ভিডিও ভাইরাল হবার পর, অনেকে ভারতের মিডিয়া গুলোকে কটুক্তি করে নানা রকম মন্তব্য করছেন।

১ ঘন্টা ৫৪ মিনিটের ভিডিওতে নাস্তিক জাভেদ আক্তার ও মুফতি সামাইলের মধ্যে চরম আকারে তর্ক প্রতিযোগিতা হয়। অনুষ্ঠানের প্রথমেই মুফতি সামাইল ৭ মিনিট কথা বলার সুযোগ পায়, সেখানে তিনি সৃষ্টিকর্তা যে আছে। সেই বিষয়ে বিভিন্ন যুক্তি ও উদাহরণের দিয়ে বোঝাতে থাকে। এমনিতেই তো ভিডিও টি অনেক বড় ও অনেক কথা আলোচনা করা হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু পয়েন্ট হাইলাইট করা হলো।
জাভেদ আক্তার বলেন, গাযায় ৪৫ হাজারেরও বেশি শিশু হত্যা করা হয়েছে। যদি সৃষ্টিকর্তা সত্যিই থাকে তাহলে কেন থামাচ্ছে না। যদি থেকেও, না থামাই তাহলে খোদা থাকা আর না-থাকা উভয় সমান। তিনি বলেন খোদা যদি সত্যিই থাকতো তাহলে অবশ্যও নিষ্পাপ শিশুদের বাঁচাতো।
খোদা নেই বলেই বর্তমানে পৃথিবীর এমন অবস্থা। যদি খোদা সত্যিই থাকতো তাহলে পৃথিবীতে এত ঝামেলা সৃষ্টি হতো না। জবাবে, মুফতি সাহেব বলেন, দুনিয়া একটি পরিক্ষা ক্ষেত্র। এজন্য আল্লাহ দুনিয়ায় মানুষের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেন না। যদি হস্তক্ষেপই করেন তাহলে তো যুদ্ধ, ঝামেলা সবকিছুই থেমে যাবে। তখন পরিক্ষা বলে আর কিছুই থাকবেনা।
তখন জাভেদ আক্তার বলেন, দোয়া করলে তো খোদা মানুষের মনের আশা পুরণ করে। কাউকে চাকরি দেয়, কাউকে গ্রিনকার্ড দেয় আবার কাউকে মামলা মুকদ্দমায় জিতিয়ে দেন। এখানে আল্লাহ হস্তক্ষেপ করছেন। একজনের চাকরি পাইয়ে দিচ্ছেন। অন্যজন নাপেলেও সমস্যা নেই। এখানে কিভাবে আল্লাহ হস্তক্ষেপ করছেন।
আর যখন কথা আসে, গাযার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। তখন তো আল্লাহর কোথায় খুঁজে পাওয়া যায়না। যদি শিশু হত্যা করে আল্লাহ পরিক্ষা নেই। এ-সব দেখে তামাসা করে তাহলে খোদা থাকা আর না থাকা উভয়ই সমান।
তিনি বলেন, যদি খোদা সত্যিই থাকে তাহলে আমাকে প্রমাণ দিন, আমি মেনে নিবো। কিন্তু কোনো আকিদা বা বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে আমি কারো গোলামি করতে পারবো না। হতে পারে খোদা বলতে কেউ নেই, তখন কি হবে? যদি কেউ প্রমাণ দিতে পারে তাহলে আমি এখনও প্রস্তুত ধর্ম গ্রহণ করবার জন্য। কিন্তু আফসোস, এখানো পর্যন্ত কেউ আমাকে সামান্য তমও প্রমাণ দেখাতে পারিনি।
এই নাস্তিকের আরো একটি প্রশ্ন ছিলো, যেটি নাস্তিকদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, খোদা যদি থাকেই তাহলে কোন ধর্মের খোদা আছে। পৃথিবীতে যদি দশটি বড় ধর্ম নিই, তাহলে দেখবেন- সেখানে ১০ টি খোদা আছে। যদি কোনো এক খোদার মানি তাহলে সঠিক হবার সম্ভবনা ১০ শতাংশ।
আর যদি আমি নাস্তিক হয়, তাহলে হয় খোদা আছে, না হয় খোদা নেই। অর্থাৎ সঠিক হবার সম্ভবনা ৫০ শতাংশ। এর মানে দাড়ায়, আপনি ১০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নতি করেছেন যা ৪০ শতাংশ প্রোমোশন। এজন্য আমি আপনাদের থেকে অনেক এগিয়ে। এগোতে দেন না, সমস্যা কোথায়।
দুনিয়ায় এত ধর্মের মধ্যে একটি ধর্ম সত্য। বাকি গুলো ভুল। যদি আপনি হিন্দু হোন, আর আপনার ধর্ম যদি সত্য হয়। তাহলে যে মুসলিম, সে নরকে যাবে। তাহলে ১ টি ধর্মের অনুসারী ছাড়া সবাই জাহান্নামে যাবে। আপনার ধর্ম সত্য নাহলে আপনি পাবেন, চরম নির্যাতন ও শাস্তি।
আসলে ভিডিও টি অনেক বড় হওয়ায়, সমস্ত কিছু তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য গুলোর কিছু অংশ তুলে ধরবার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনিতেই নাস্তিকেরা সচারাচর যেসব প্রশ্ন করে সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কারণ এমন প্রশ্ন আমরা অনেকেই সচারআচার শুনে অভস্ত।
যেমন, আল্লাহকে কে তৈরি করেছেন, মহাবিশ্ব সৃষ্টি হবার আগে তো কিছুই ছিলো না। এমনকি সময়ও ছিলো না তাহলে কিভাবে কেউ তৈরি করবে। যখন সময়ই ছিলো না তাহলে কিভাবে কেউ তৈরি করতে পারে?
প্রতি উত্তরে মুফতি সামাইল বলেন, আল্লাহ সময়ের উর্ধে। এমন কি সে সবকিছুর উর্ধে এজন্যও তো, তাকে খোদা বলা হচ্ছে। যে সময়ের সৃষ্টি করেছেন – এটা জরুরি নয় যে তাকেও সময়ের মধ্যেই থাকতে হবে। যদি সে সময়ের মধ্যে থাকে। তাহলে সে আর খোদাই, থাকবেনা।
কারণ যার শুরু আছে, তার শেষও আছে। কিন্তু খোদার সংগাই তো, তিনি কখনো জন্মাইনি আবার মরবেও না। এজন্য যদি খোদা টাইমের মধ্যে থাকে তাহলে কিভাবে এই শর্ত পুরণ হবে। যে টাইম সৃষ্টি করেছেন তাকে টাইমের মধ্যে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
এমন অনেক সুন্দর সুন্দর যৌক্তিক প্রশ্ন করেছেন, জাভেদ আক্তার। যে প্রশ্নগুলো সাধারণত নাস্তিকেরা করে থাকে। আর প্রতিউত্তরে, মুখ ভাঙা জবাব দেন মুফতি সাহেব। এছাড়াও অনেক প্রশ্ন ও উত্তর হয়েছে। সমস্ত কিছু জানতে হলে Lallantop এ থাকা ১ ঘন্টা ৫৪ মিনিটের ভিডিও দেখতে হবে। সাথে একই ভিডিও মুফতি সামাইল সাহেবের ইউটিউব চ্যানেলেও আছে।
শেষে, দর্শকদের প্রশ্ন করার সময়, একজন দর্শক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেন, নাস্তিক জাভেদ আক্তারের কাছে। সেই দর্শক বলেন, ধর্ম আমাকে নানা রকম সুবিধা দিচ্ছে। বিচার পাবার আশা, অনেকগুলো উৎসব ইত্যাদি। এখন এই দোকান ছেড়ে যে, আমি আপনার দোকানের দিকে আকৃষ্ট হবো। এজন্য আপনি কি কি অফার করছেন।
জবাবে, জাভেদ আক্তার বলেন, ধর্মে উৎসব এজন্য দেওয়া হয়, যাতে সেই ধর্মের জনগণ আনন্দে থাকে। কারণ আনন্দ করা জনগণের ভালো লাগে। তাই ধর্ম নামে কোম্পানি চালানোর জন্য এমন আনন্দ করার সেক্টরের প্রয়োজন হয় – যার নাম উৎসব।

তিনি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন- যিশু খ্রিষ্টের জন্মতারিখ ২৫ ই ডিসেম্বর দেওয়া হয়েছে। এই জন্ম তারিখে পঁচিশে ডিসেম্বর ক্রিসমাস পালন করা হয়। কিন্তু আসলে কি যিশু খ্রিষ্টের জন্মতারিখ ২৫ ডিসেম্বর। না, যিশুর জন্ম বাইবেল, ইতিহাস কোথায় ২৫ ডিসেম্বর দেওয়া নেই।
বরং বিভিন্ন ইতিহাসবীদের মতে, যিশু জন্ম এপ্রিল মাসে। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী ইসা আ এর জন্ম জুলাই আগষ্ট মাসে হতে পারে। তাহলে ২৫ সে ডিসেম্বর কোথায় পেলো খ্রিষ্টানেরা। আসলে আগে রোমান শাসন আমলে রাজা যেই ধর্ম পালন করতো সেই ধর্ম তার পুজারাও পালন করতো।
রোমানরা তখন সুপার পাওয়া ছিলো। তারা যেই ধর্ম পালন করতো, সেখানে ২০ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর বা শীতের সময় তাদের ধর্মের একটি উৎস পালন করা হতো। তাই যখন রাজা খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহন করেন। তখন জনগণের আনন্দের জন্য। দুটি ধর্মের উৎসব একত্রে করেন। কারণ জনগণের আনন্দ প্রয়োজন।
এজন্যও উৎসবের প্রয়োজন হয় – যারা ধর্ম নামে কোম্পানি চালায়। কিন্তু আমাদের দোকানে আকর্ষণ হবার জন্য যদি, আপনার উৎস প্রয়োজন হয়, তাহলে আমার দোকানই সবার থেকে উত্তম। কারণ আপনি যদি মুসলিম হন তাহলে শুধু ঈদ পালন করতে পারবেন।
অন্য ধর্মের উৎসব পালন করতে পারবেন না কিন্তু একজন নাস্তিক হলে আপনি সব ধর্মের সকল উৎসবই পালন করতে পারবেন। যেমন আমার বাড়ি ঈদের সময় ঈদের আনন্দ। হোলির সময় হোলির আনন্দ। বড়দিনের সময় বড় দিনের আনন্দ। আমি সবকিছুই পালন করি। কারণ আনন্দ করা ভালো জিনিস।
এখানে মুফতি সামাইল সাহেবের উত্তর, প্রেত্যেক প্রশ্নের সাথে দেওয়া হয়নি। কারণ প্রশ্ন যদি এত বড় হয় তাহলে উত্তর কত বড় হবে? এজন্য মুলত সম্পুর্ণ ভিডিওর সারাংশ তুলে ধরার চেষ্টা করেছে । আপনি চাইলে আরো জানতে সম্পুর্ণ ভিডিওটি এখানে ক্লিক করে জানতে পারেন।
Source : international News agencies & Special correspondent