বাফেলো, নিউ ইয়র্ক : গভীর শীতের রাত। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। এমন শীতের রাতে ৫৬ বছর বয়সী একজন অন্ধ প্রতিবন্ধি রোহিঙ্গা, নুরুল আমিনের সাথে ঘটে যায় লোমহর্ষক ঘটনা। সেই শীতের রাতে একটি বন্ধ কফি শপের সামনে তাকে নামিয়ে রেখে চলে যায়, মার্কিন বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্টরা।
পাঁচ দিন পর, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। পেরি স্ট্রিটের একটি রাস্তায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। এই অন্ধ রোহিঙ্গাকে যে এজেন্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিলো, তার বাড়ি থেকে প্রায় ৫ থেকে ৬ মাইল দূরে। শীতের তীব্র ঠান্ডা তার জীবন কেড়ে নিয়েছে বলে প্রাথমিক পর্যায়ে ধারণা করা হচ্ছে।
যে স্থানে তাকে ছেড়ে আসে তার আশেপাশে মানুষে যাতায়াত খুবই স্বল্প । অচেনা পরিবেশ, অন্ধ একজন ব্যক্তি। যোগাযোগ করার কোনো সুযোগ নেই। সাথে রাতের ঠান্ডা, ক্ষুধার জ্বালা সবকিছু একজন প্রতিবন্ধি মানুষের জীবন কেড়ে নেবার জন্য যথেষ্ট।
নুরুল আমিন ছিলেন একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী। তিনি প্রায় অন্ধ ছিলেন। হাঁটার জন্য লাঠির ওপর নির্ভর করতেন। ইংরেজি ভাষা বলতে পারতেন না। অর্থাৎ তিনি কারো সাথে কথা বা যোগাযোগ করে সাহায্য চেতেও পারতেন না।
ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডায় মুসলিম ছাত্রদের নামাজে বাধা: তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের

তিনি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন চলছে। এজন্য সেখান থেকে বেশিরভাগ রোহিঙ্গা অন্য দেশে পালিয়ে যায়। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশে।
আবার অনেকে সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশে আশ্রয় চেয়েছিলো। আমেরিকায় তা পরিচিত ব্যক্তি থাকায়, তিনি আমেরিকার কাছে সাহায্য চেয়েছিলো।
তিনি আমেরিকার কাছে নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে এসে তিনি নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র ১৫ মাসের মধ্যে তার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।
১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি এরি কাউন্টি হোল্ডিং সেন্টার থেকে মুক্তি পান। একটি ছোট অভিযোগের কারণে তিনি প্রায় এক বছর আটক ছিলেন। মুক্তির পর তাকে ইমিগ্রেশন ডিটেইনারে বর্ডার প্যাট্রোলের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পরে সিদ্ধান্ত হয়, তাকে ডিপোর্ট করা যাবে না। কিন্তু এরপর যা ঘটে, তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়নি।
এজেন্টরা তাকে একটি টিম হর্টনস কফি শপের সামনে নামিয়ে দেন। দোকানটি তখন বন্ধ ছিল। রাত গভীর ছিল। চারদিকে ছিল ঠান্ডা আর নীরবতা। যা একজন মানুষের থাকার জন্য নিরাপদ ছিলো না। বিশেষ করে একজন অন্ধপ্রতিবন্ধির জন্য।
নামানোর আগে, এমনকি তার পরিবারকে পর্যন্ত কোনো খবর দেওয়া হয়নি। তার আইনজীবীকেও জানানো হয়নি। তাকে কোথায় নামানো হলো, তা কেউ জানত না।
এপস্টাইন কেলেঙ্কারির জেরে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রধান সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের পদত্যাগ
পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি শুধু বুটি পরে ছিলেন। গায়ে যথেষ্ট শীতের কাপড় ছিল না। সেই রাতে বাফেলো শহরে তাপমাত্রা খুব কম ছিল। যা এমন পোষাকে থাকা অসম্ভব।
বাফেলো শহরের মেয়র এই ঘটনাকে অমানবিক বলেছেন। তিনি বলেন, এটি দায়িত্বহীনতার বড় উদাহরণ। এমন ঘটনা হওয়া কোনো মতেই উচিত নয়।
নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, একজন মানুষ গণহত্যা থেকে পালিয়ে এসে এভাবে মারা যেতে পারেন না। তিনি এই ঘটনার পূর্ণ তদন্তের করে, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
কংগ্রেসম্যান এবং আরও কয়েকজন নেতা ঘটনার তদন্ত চান। তারা জানতে চান, কেন একজন অসহায় মানুষকে এভাবে একা ফেলে রাখা হলো। এই মৃত্যুকে তারা অপরাধমূলক অবহেলা বলে অভিহিত করেছে। তারা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
পরিবার এখন গভীর শোকে আছে। তারা জানতে চায়, কেন তাকে নিরাপদ জায়গায় নেওয়া হলো না। কেন পরিবারকে ফোন করা হলো না। পরিবারকে জানানো হলে আজ এই পরিনতি হতো না।
সরকারের সিদ্ধান্ত বাতিল : প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিষিদ্ধ ঘোষণা অবৈধ
নুরুল আমিনের জীবন সহজ ছিল না। রাখাইন থেকে পালিয়ে তিনি অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। তিনি ভেবেছিলেন, নতুন দেশে নিরাপদ থাকবেন।কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে একা অন্ধকারে, বরফের মধ্যে, ঠান্ডা রাস্তায় হাঁটতে হয়েছে, কোনো সাহায্য ছাড়াই।
এই ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়। এটি আমাদের মানবতার পরীক্ষা। একজন অসহায় অন্ধ মানুষ কি এভাবে রাস্তায় পড়ে মারা যাবে?
Watch Muslim Sangbad on You Tube অন্ধ রোহিঙ্গার করুণ মৃত্যু: গভীর শীতে বন্ধ কফি শপের সামনে ফেলে যাওয়ার অভিযোগ বর্ডার প্যাট্রোলের বিরুদ্ধে
যে দেশ নিজেকে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রতীক বলে, সেখানে এমন ঘটনা প্রশ্ন তোলে। শরণার্থীরা কি সত্যিই নিরাপদ? সেখানে অসহায় মানুষ কি সত্যিই নিরাপদ?
মানবাধিকার সংগঠন গুলো, নুরুল আমিন শাহ আলমের আত্মার শান্তি কামনা করছে। তার পরিবারের জন্য শক্তি কামনা করছে। ভবিষ্যতে আর এমন ঘটনা যেন না ঘটে, সেটিই এখন সবার দাবি।
Muslim Sangbad – মুসলিম উম্মাহর কন্ঠস্বর
Source : Al Jazeera, Reuters
Muslim Sangbad Special correspondent.



