জেরুসালেম: ইরান ইজরায়েল ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধের কারণে, এবার পবিত্র আলআকসা মসজিদ বন্ধ থাকতে পারে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। জেরুসালেমে অবস্থিত ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান টানা ১৮ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
রমজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন নিষেধাজ্ঞা মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ইজরায়েলের একতরফা হুকুমদারিতা, মুসলমানদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের মন্তব্য, “মুসলমানদের মসজিদ কেন, ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।”
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ২৮ ফেব্রুয়ারি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যখন ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হয়। এরপর থেকে পরিস্থিতি ক্রমাগত উত্তেজনাপূর্ণ থাকায় আল-আকসা কম্পাউন্ড সাধারণ মুসল্লিদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
১৭ মার্চ পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা টানা ১৮ দিনে গড়িয়েছে। এর আগে ১৫ মার্চ ছিল ১৬তম দিন, যা ইতোমধ্যেই রমজানের গুরুত্বপূর্ণ সময়কে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে রমজানের ২১,২৩,২৫,২৭, ও ২৯ রাতের, যেকোনো একটি রাত লাইলাতুলকদর।

এই সময়েও পবিত্র আল আকসা মসজিদে মুসলমানদের নামাজ ও ইবাদত করতে দেয়নি ইজরায়েল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা ঈদুল ফিতর পর্যন্ত এবং সম্ভবত তার পরেও বহাল থাকতে পারে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ইসলামিক ওয়াকফকে জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা উল্লেখ করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি। এজন্য বড় ধরনের জনসমাগমকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে ইজরায়েল কর্তৃপক্ষ।
তবে এই ব্যাখ্যার বিস্তারিত খুব সীমিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে “নিরাপত্তা পরিস্থিতি” শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হলেও প্রমাণ দেখাতে পারেনি। যেমন নির্দিষ্ট কোনো গোয়েন্দা তথ্য বা হুমকির মাত্রা প্রকাশ করা হয়নি, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
ওল্ড সিটি এলাকায় কঠোর লকডাউন জারি করা হয়েছে, যেখানে শুধুমাত্র স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ফলে হাজার হাজার মুসল্লি ঐতিহাসিক এই মসজিদে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রমজানের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো জুমার নামাজ আদায় করতে দেওয়া হয়নি। যা ১৯৬৭ সালের পর এক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইভাবে লাইলাতুল কদরের রাতেও শত শত পুলিশ সদস্য প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেয়।
আল-আকসা মসজিদ টানা ১৮ দিন বন্ধ, ঈদেও প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা হতে পারে?

ফলে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে মসজিদের বাইরে, রাস্তা বা গেটের সামনে নামাজ আদায় করেছেন। ডামাস্কাস গেট ও জাফফা গেটের আশপাশে এমন দৃশ্য নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
মুসলমানরা হবে “বন্যার ফেনার মতো”নবী (স)-এর ১৪০০ বছরের ভবিষ্যদ্বাণী কি সত্য হচ্ছে?
ইসলামিক ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমও কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে। সাধারণত যেখানে বহু কর্মী কাজ করেন, সেখানে এখন প্রতি শিফটে সর্বোচ্চ ২৫ জন কর্মীকে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ বা প্রবেশের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ, যেমন পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ইউনিটের কর্মীরাও প্রবেশের অনুমতি পাননি বলে জানা গেছে।
ইসলামিক ওয়াকফের আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক আউনি বাজবাজ সতর্ক করে বলেছেন, “এই নিষেধাজ্ঞা আপাতদৃষ্টিতে অস্থায়ী মনে হলেও তা স্থায়ী রূপ নিতে পারে।”
অন্যদিকে আল-আকসার ডেপুটি প্রধান ড. মুস্তাফা আবু সোয়ে বলেন, “রমজানের মতো সময়ে এই বন্ধ মুসল্লিদের হৃদয়ে গভীর আঘাত দিয়েছে। নিরাপত্তা যদি উদ্বেগের বিষয় হয়, তাহলে মসজিদের ভূগর্ভস্থ হল ব্যবহার করা যেতে পারত।”
প্যালেস্টাইন অথরিটি অভিযোগ করেছে, নিরাপত্তার অজুহাতে বাস্তবে রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। তাদের মতে, এটি স্ট্যাটাস কো লঙ্ঘনের একটি অংশ।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়েছে। CAIR – এই পদক্ষেপকে “অভূতপূর্ব নিষেধাজ্ঞা” হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং তা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একইভাবে OIC, আরব লীগ এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন এই ঘটনাকে ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত আটটি মুসলিম দেশ, যার মধ্যে সৌদি আরব ও জর্ডান রয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞাকে “অযৌক্তিক” বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং জেরুসালেমে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশ্লেষকরাও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেকের মতে, আল-আকসা শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি প্যালেস্টাইনিদের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক থায়ের আবু রাস বলেন, “এটি একটি সম্মিলিত পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু, যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে।”
আল-আকসা মনিটরিং গ্রুপের প্রধান নাসের আল-হিদমি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যুদ্ধ শেষ হলেও জেরুসালেমে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে নিকাব বিতর্ক : নিকাব কি আসলেই ইসলামী পোশাক?
ঐতিহাসিকভাবে আল-আকসা কম্পাউন্ড জর্ডানের ইসলামিক ওয়াকফের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে । যেখানে ইসরায়েল নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এই ব্যবস্থাকে “স্ট্যাটাস কো” হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সেই স্ট্যাটাস কো-কে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ভবিষ্যতে ধর্মীয় উৎসবগুলোতে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিস্তারিত দেখুন Muslim Sangbad YouTube Channel এ, ক্লিক করুন।
সামগ্রিকভাবে, আল-আকসা মসজিদ বন্ধের এই ঘটনা শুধু একটি নিরাপত্তা পদক্ষেপ নয়, বরং এটি একটি জটিল রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও মানবিক সংকটের প্রতিফলন হিসেবে সামনে এসেছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
এবার হয়তো, পবিত্র আল আকসা মসজিদে ইদের নামাজ আদায় করতে দিবে না ইজরায়েল কতৃপক্ষ। যা ফিলিস্তিন মুসলমানদের জন্য হতাশার হয়ে দাড়িয়েছে। এখন এমন একটি সময় ফিলিস্তিন বাসি পালন করছে, যেখানে তাদের মসজিদই তাদের নয়।
মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান এখন ইহুদিদের কবলে কিন্তু ২০০ কোটি মুসলমান কিছুই করতে পারছে। এমনকি প্রতিবাদ সমাবেশ তাই দেখা যাচ্ছে না।
মুসলিম সংবাদ – মুসলিম উম্মাহর কন্ঠস্বর
Sources: 5 Pillars, Al Jazeera, Arab News & Muslim Sangbad Special correspondent.



