bangladesh-niqab-controversy-niqab-islamic-dress
বাংলাদেশে নিকাব বিতর্ক : নিকাব কি আসলেই ইসলামী পোশাক?
বাংলাদেশ |ডেস্ক রিপোর্ট | প্রতিবেদন : হৃদয় মাহমুদ।
মুসলিম নারীদের পোশাক নিকাবকে ঘিরে, বিএনপি নেতা মোশাররফ ঠাকুরের একটি মন্তব্য, নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, ” নিকাব মুসলমানদের পোশাক নয়, এটি ইহুদি বেশ্যাদের পোশাক ।”
এমন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ধর্মীয় অবমাননা ও নারীদের পোশাকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে মুসলিম উম্মাহ এই মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তাপ ছড়িয়েছে।
কিন্তু আসলেই কি নিক্কাব ইসলামের পোশাক নয়? হিজাবই কি ইসলামের আসল পোশাক? ইসলামের আসল পোশাক কোনটি? কোরআন হাদিস এ বিষয়ে কি বলে? চলুন বিস্তারিত জানি আজকের প্রতিবেদনে। বিষয়টি স্পর্শ কাতর হওয়ায়, সম্পুর্ন প্রতিবেদন না পড়ে মন্তব্য করবেন না।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে, ১২ জানুয়ারি, সংস্কৃতিক আহবায়ক ও বিএনপি নেতা – মোশাররফ ঠাকুরের একটি বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে। তিনি বলেন, ” মুসলিম মেয়েরা যে নিকাব পরে তা মুসলমানদের পোশাকই নয়। মুসলমানদের পোশাক আসলে হিজাব। আর নিকাব পরতো, আগেকার ইহুদিরা। বিশেষ করে যে সব ইহুদিরা বেশ্যাবৃত্তিতে জড়িত ছিলো। তারাই হিজাব পরতো।

এই বিষয়ে কেউ কথা বলে না। কথা বললে, মব সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা সকরবার চেষ্টা করে, এক পক্ষ। কিন্তু আমি সাহস করে বলে দিলাম। ” এই বক্তব্য ভাইরাল হবার পর, মুসলিম উম্মাহ মোশাররফের মন্তব্যে চরম নিন্দা প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি, নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এ বিষয়ে বলেন, “মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের বক্তব্যকে কেবল ইসলামী শরিয়তের বিরোধী নয়, বরং মুসলিম নারীর মৌলিক অধিকারকে পদদলিত করার হীন প্রচেষ্টা। তাই এবিষয়ে চরম নিন্দা জানাচ্ছে, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। “
কিন্তু এখনো পর্যন্ত এই বিএনপি নেতা, ক্ষমা চাওয়া তো দুরের কথা। এবিষয়ে দুঃখ প্রকাশও করেনি। যা নিয়ে বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে । বিভিন্ন ইসলামী সংস্থা গুলো বিষয়ে নিন্দা ও ছোট পরিশরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন।

অনেকে বলছে, এটা ইসলামী পোশাকের অপমান। ইসলামী পোশাকের অপমান অর্থাৎ ইসলামের অপমান। এখানে প্রশ্ন আসে, আসলেই কি নিকাব ইসলামের পোশাক? আসলেই কি ইসলামের কোনো নিজস্ব পোশাক আছে? উত্তর হল না। আসলে ইসলামের কোনো নিজস্ব পোশাক নেই। এই কথা শুনে অনেকেই হওতো বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু এটাই সত্য।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সৌদি আরবসহ আরবের অন্যান্য মুসলিম দেশে কেন নিকাব বা বোরখা পরা হয়। এদ্বারা কি প্রমাণ হয়না এটা ইসলামী পোশাক? উত্তর হলো আবারও না। নিকাব বা বোরখা এটা ইসলামের পোশাক নয় বরং নিকাব, বোরখা, হিজাব এটা আরবের পোশাক।
এটা আরবের সংস্কৃতির অংশ। এর প্রমাণ হলো, নবিজি আশার আগেও আরবের জনগণ হিজাব, নিকাব পরতো। তৎকালীন সময়ের মক্কা, মদিনার ইহুদি, খ্রিষ্টানেরা আরবের এই পোশাক, নিকাব ও হিজাব পরতো। এদ্বারা প্রমাণ হয় যে, নিকাব ও হিজাব ইসলামের পোশাক নয় বরং আরবের পোশাক।

আসলে ইসলামের নিজস্ব কোনো পোশাক নেই। মহান আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেছেন, ” সূরা আন-নূর (২৪:৩১)-এ মুমিন নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখা, লজ্জাস্থান হেফাজত করা এবং প্রকাশ্য সৌন্দর্য প্রদর্শন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই আয়াতে বলা হয়েছে, নারীরা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বুক ঢেকে রাখে, যা পোশাকে শালীনতা ও সংযম বজায় রাখার একটি মৌলিক নীতি হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে সূরা আল-আহযাব (৩৩:৫৯)- এ নবী মুহাম্মদ (সা.)- কে নির্দেশ দেওয়া হয়, তিনি যেন তার স্ত্রী, কন্যা এবং সকল মুমিন নারীকে বলেন, ” তারা নিজেদের ওপর জিলহাব বা ঢিলেঢালা চাদর টেনে নিতে। আয়াত অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য হলো নারীদের শালীন পরিচয় স্পষ্ট করা এবং সামাজিক হয়রানি বা অনাচার থেকে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
এছাড়া সূরা আল-আহযাব (৩৩:৩৩)- এ নারীদের জাহেলি যুগের মতো প্রদর্শনমূলক সাজসজ্জা ও দৃষ্টি আকর্ষণকারী আচরণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কুরআনের এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামে নারীদের পোশাকের মূল লক্ষ্য সৌন্দর্য প্রদর্শন নয়; বরং শালীনতা, মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তা বজায় রাখা।

বিভিন্ন ইসলামী স্কলারদের মতে, “নারীদের এমন পোশাক পরা উচিত যা, তাদের চুল ও বুক ঢাকা থাকে সাথে ঢিলেঢালা, এমন পোশাক পরা, যা তাদের শরিরের আকৃতি বোঝা না যায়। এগুলো ঠিক রেখে একজন নারী যেকোনো পোশাক পরতে পারবে। “
কোরআন হাদিস অনুযায়ী, ইসলাম বিশ্বের সকল মানুষের জন্য পাঠানো হয়েছে। এজন্য ইসলামের নিজস্ব কোনো সংস্কৃতি নেই। বেশিরভাগ মুসলমান আরবের সংস্কৃতি কে ইসলামের সংস্কৃতি বলে গুলিয়ে ফেলে। কিন্তু এটা সঠিক নয়। ইসলাম কোনোদিন কারো ওপরে সংস্কৃতি চাপিয়ে দেই না। ইসলাম সার্বজনীন, সবার জন্য। হোক সে কালো, সাদা, বাংগালী, আমেরিকান অথবা আরবীয়ন। ইসলাম সবার জন্য সমান।
অনেক ইসলামী বিশেষজ্ঞের মতে, কোরআনে যেমন পোশাক পরতে বলা হয়েছে। তা একেবারে হিজাবের সাথে মিলে যায়। যেখানে স্বাভাবিক সুন্দর্য ব্যথিত , যেমন হাত, পা, মুখমণ্ডল বাদে বাকি সবকিছু ঢাকা থাকে।
এই পোশাক পরলে, শরীরের আকৃতি বোঝা যায় না, সাথে চুল ও বুকও ঢাকা থাকে। এজন্য এটাই সবথেকে গ্রহণযোগ্য ইসলামী পোশাক বলা হয়ে থাকে। কিন্তু বিশেষ অবস্থায় অথবা নিজের ইচ্ছেতে সম্পুর্ণ মুখ ঢাকতে পারে। কিন্তু এটার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু উৎসাহ দেওয়া হয়। এটা সম্পুর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দ।

তাহলে এসব আলোচনা থেকে বোঝা যায়, নিকাব ইসলামের পোশাক নয়, হিজাবও ইসলামের পোশাক নয় বরং এই পোশাক গুলো ইসলামে বর্ণনাকৃত পোশাকের মত। এজন্য হিজাব কে ইসলামের পোশাক হিসেবে সবাই উল্লেখ করে। যা বর্ণনা অনুযায়ী ঠিক। কিন্তু কোরআনে বলে দেওয়া হয়নি হিজাব বা নিকাব মুসলমানদের পোশাক।
এবার আসি, বিএনপি নেতা মোশাররফ ঠাকুরের কথায়। তিনি বলেছেন, “নিকাব নাকি ইহুদি বেশ্যাদের পোশাক।” এটা কি ঠিক, উত্তর হলো না। এটা সম্পুর্ণ ভুয়া তথ্য। মুলত মুসলিম ও ইহুদি ধর্মের অনুসারীদের কটুক্তি করবার জন্য এটি ছড়ানো হয়েছে।
এবিষয়ে ইতিহাস কি বলে :
ইতিহাস অনুযায়ী আগে ইহুদি বেশ্যারা মুখ ঢাকতো না বরং শরিরের বিভিন্ন অংশ প্রকাশ করতো। যাতে তাদের ওপর ভোক্তার আকর্ষণ বাড়ে। এমনকি ইহুদিরা মনে করতো, মুখ ঢেকে রাখা শুধু অভিজাত গোষ্ঠীদের অধিকার। বেশ্যা ও দাসীদের জন্য নিকাব পরা ছিলো নিষেধ।
যেমন অনেকে ভাবে, শাহজাহান তাজমহল বানানোর পর তার মিস্তিরিদের হাত কেটে নিয়েছিল কিন্তু এটা মিথ্যা, গুজব। যা মুলত মুসলমানদের খলনায়ক বা খারাপ বানানোর জন্য বিশেষ শ্রেণির হিন্দুরা ছড়িয়েছিলো। একইভাবে নিকাব যে, ইহুদি বেশ্যাদের পোশাক এটাও ভুয়া।
For More update Visit Our YouTube Channel
তথ্য সুত্র : বাংলাদেশী মিডিয়া, কোরআন, হাদিস এবং বিশেষ প্রতিনিধি।


